সায়ীদ আবুবকর
ধরা যায় ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির প্রায় সব পত্রপত্রিকায় আমার কবিতা নিয়মিত ছাপা হয়ে আসছিল। ইত্তেফাক থেকে শুরু; সেখান থেকে বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার, সংবাদ, সচিত্র বাংলাদেশ, দৈনিক বাংলা, ইনকিলাব, সংগ্রাম, পালাবদল, পূর্ণিমা, রোববার, শৈলী প্রভৃতি পত্রিকায় দেদারছে লিখে যাচ্ছি। ২০ বছরের টগবগে যুবক তখন; চোখেমুখে কবিতার কালো ঘোর, অন্তরে আবেগের প্রচণ্ড তুফান, মাথায় কেবল কবিতা আর কবিতা; লিখছি আর ডাকে পাঠাচ্ছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে; বাঘা বাঘা সব সাহিত্যসম্পাদক তা হাতে পাচ্ছেন আর ছাপছেন; ঢাকার কেউ আমাকে চেনেন না। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠাচ্ছি বলে কেউ কেউ মনে করছেন, আমি বোধহয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক কবি আবুবকর সিদ্দিকের ছেলে (একথা আমাকে জানিয়েছিলেন সচিত্র বাংলাদেশের সম্পাদক কবি কে জি মোস্তফা)। সংবাদ গুচ্ছ কবিতা ছাপছে, বড় বড় ঈদ-ম্যাগাজিনে কবিতা ছাপা হচ্ছে, তা বোগল দাবা করে আমি পথেঘাটে হাঁটছি, মাঝে মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে গিয়ে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে পড়াচ্ছি; সবাই প্রশংসা করছে; আমি নিজেকে পুরোদস্তুর কবি ভাবতে শুরু করেছি। এর মধ্যে ঢাকায় গিয়েছি কয়েকবার। অনেকের সাথে পরিচিত হয়ে নিজেকে ধন্য ধন্য মনে করছি। একটানা কয়েক বছর এভাবে লেখালেখি চলতে থাকলো। কবিতার বই করতে হবে তখনও মনে হয়নি আমার।
১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে আমার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব বললো, একটা কবিতার বই করে ফ্যালো। কিন্তু কিভাবে? ভাবনায় পড়ে গেলাম। প্রকাশক পাবো কোথায়? কিভাবে বই প্রকাশ করতে হয়, তাও জানি না। সন্ধ্যার পর প্রায়ই রাজশাহী শহরের সাহেব বাজারে আমরা কিছু তরুণ কবি-সাহিত্যিক আড্ডা দিতাম বিভিন্ন চা-পুরির দোকানে। সেখানে ছোটগল্পকার নাজিব ওয়াদুদ আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বই করতে হবে, তিনি ছোটগল্পের বই করবেন আর আমি কবিতার বই। তখনও পর্যন্ত দুজনের কারো কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। যে-কাজটি প্রথমে আমাদের করতে হবে, আমরা মনে করলাম, তা হলো বইয়ের প্রচ্ছদ কোনো শিল্পীকে দিয়ে আঁকিয়ে ফেলা। সিদ্ধান্ত হলো, আমরা মোমিন উদ্দীন খালেদকে দিয়ে প্রচ্ছদ করাবো। এ উদ্দেশ্যে দুজনে ঢাকায় গেলাম। মোমিন উদ্দীন খালেদ আগে থেকেই আমাদের লেখার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। দুদিন পর তিনি বাসায় ডেকে নিয়ে প্রচ্ছদ দুটি আমাদের হাতে তুলে দিলেন। আমরা দুজনে এক হাজার করে মোট দু-হাজার টাকা তাঁকে দিয়েছিলাম। প্রচ্ছদ নিয়ে আমরা রাজশাহীতে ফিরে এলাম। আমার প্রচ্ছদ আমার কাছে রইলো। কয়েক মাস কেটে গেল। আমি প্রচ্ছদটা বাকশোর মধ্য থেকে বের করে মাঝেমধ্যে দেখতাম আর ভাবতাম, বই কি আদৌ হবে। এর মধ্যে একটা পান্ডুলিপি তৈরি করে ফেলেছি ৩৮টি কবিতা দিয়ে; কতবার যে পরিবর্তন করেছি কাটাকুটি করে, তাও তৃপ্তি আসে না, শুধু মনে হয়, এটা না হয়ে ওটা হলে বোধহয় ভালো হতো। প্রথমে নাম রেখেছিলাম ‘সোনার কাঠের নাও’; দুদিন পর আর ভালো লাগলো না, রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ ‘সোনার তরী’ মনে হতে লাগলো। ফলে এ নাম ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। এবার নাম দিলাম ‘আলাদা পাখির গান’। দুদিন পর তাও ভালো লাগলো না। শুধু মনে হচ্ছিল, এমন একটি নাম চাই, একেবারে নতুন, ব্যঞ্জনাময়, রূপক, প্রতীকী হবে, অনুপ্রাসও থাকবে। অনেক ভাবতে ভাবতে শেষে সচিত্র বাংলাদেশ-এর ঈদসংখ্যায় ছাপা হওয়া আমার একটি কবিতার শিরোনামই বেছে নিলাম ‘প্রণয়ের প্রথম পাপ’। নামটা আমার মনে গেঁথে গেল। প্রতীকীই ! প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রণয়ের প্রথম পাপই তো বটে! নাম ফিক্সড করে ফেললাম। পান্ডুলিপি প্রস্তুত। কেবল প্রকাশক নেই।
এর মধ্যে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপের কিছু টাকা পেলাম, বেশ কিছু টাকা, পুরো চার হাজার। হঠাৎ খেয়াল হলো, ঢাকায় যাই না কেন! কোনো প্রকাশককে ধরে দেখি চার হাজার টাকায় আমার বইটা করে দেয় কিনা। গেলাম চলে ঢাকায়। একা। কয়েকটি পত্রিকা অফিস থেকে কয়েকটি লেখার বিল তুলে নিয়ে উঠলাম সিদ্দিক বাজারের হোটেল আফরিনে। সিঙ্গেল রুম। খুবই সস্তা। রাতদিনের ভাড়া মাত্র ৬০ টাকা। পাশের বরিশাল হোটেল থেকে রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে আমি আমার রুমে ফিরে এলাম। সারা রাত পাণ্ডুলিপিটা নাড়াচাড়া করলাম আর ভাবতে লাগলাম কী করা যায়, তেমন কাউকে তো চিনি না যে, তাকে গিয়ে বলি বইটা প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেন। একজন কবি ও প্রকাশক আমার একটু পরিচিত ছিলেন। তিনি একবার আমার সঙ্গে দেখা হলে বলেছিলেন, আপনার কবিতা আমার খুব পছন্দ। ভাবলাম, সকালে তাঁর অফিসে যাবো; তার সঙ্গে কথা বলে দেখি কী হয়। পরের দিন তা-ই করলাম। চলে গেলাম তাঁর অফিসে। তিনি অফিসেই ছিলেন। আমার বই করার কথা শুনে তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে নানা কথা বলতে লাগলেন। বলতে লাগলেন, ইদানীং কবিতার বই কেউ কিনতে চায় না। আল মাহমুদ-শামসুর রাহমানের বইও তেমন চলে না; তরুণ কবিদের বইয়ের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি বুঝাতে চাইলেন, তিনি আমার বই করতে চান, তবে আমাকে কিছু খরচ বিয়ার করতে হবে, কিন্তু কত তা বললেন না। আমি একবার বলতে চাইলাম, আমার কাছে চার হাজার টাকা আছে, এটা দিয়ে হলে করে দেন। কী ভেবে তা বললাম না। বললাম, ঠিক আছে, পরে দেখা করবো। সেখান থেকে বের হয়ে এসে ভাবতে লাগলাম কার কাছে যাওয়া যায়। আমার একজন সত্যিকার গুণগ্রাহী ছিলেন কবি ও অনুবাদক কাওসার হুসাইন। পাক্ষিক পালাবদলে তার নাম সহযোগী সম্পাদক পদে ছাপা হতো। তিনি তখন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। পালাবদলে তখন আমার প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। এ পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালাম থেকে শুরু করে পালাবদল-অফিসের প্রায় সকলেই আমাকে খুব স্নেহ করেন। ভাবলাম কাওসার ভাইয়ের কাছেই যাবো। দেখি উনি কী বুদ্ধি দেন।
ফার্মগেটের একটা হোটেলে দুপুরের খানা খেয়ে নিলাম। সেখান থেকে বাসে রওনা দিলাম সাভারের উদ্দেশে। বিকেল বেলা কাওসার ভাইর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় গিয়ে হাজির। তিনি আমাকে বেশ খাতির করলেন। নাস্তা টাস্তা খাওয়ালেন। তখন আমি তাকে আমার পাণ্ডুলিপির কথা বললাম। যে-প্রকাশকের কাছে গিয়েছিলাম তাঁর কথাও তাকে বললাম। তিনি কিছু টাকা দিলে আমার বইটা করে দেবেন, তাও জানালাম। কাওসার ভাই সেই প্রকাশককে ভালোভাবেই চিনতেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘সায়ীদ আবুবকর, আমার অনুরোধ আপনি এই প্রকাশনী থেকে আপনার বই করবেন না। করলে আপনার গায়ে একটা রঙ লাগবে। এটা আপনার জন্যে ভালো হবে না। আপনার খুব সম্ভাবনা আছে। আমার বিশ্বাস, আপনি একজন বড় মাপের কবি হবেন। আপনার প্রথম বইটা একটা ভালো জায়গা থেকে বের হওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে, আরো এক বছর অপেক্ষা করুন।” কাওসার ভাইয়ের কথা আমার কানে বাজতে লাগলো। আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম। আসতে আসতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, না, উনার প্রকাশনী থেকে আমার বই করার কোনো দরকার নেই।
সন্ধ্যার পর হোটেল আফরিনের দিকেই ফিরছিলাম। পথে ফকিরাপুল পড়লো। ফকিরাপুলেই পাক্ষিক পালাবদল অফিস। ভাবলাম, এত তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে কী হবে; যাই, সালাম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে যাই। সম্পাদক আবদুস সালাম বেশি ব্যস্ত থাকেন তাঁর ব্যবসায়িক কাজকর্ম নিয়ে। পত্রিকা তাঁর শখের জিনিস। তিনি শিল্পসাহিত্য ভালবাসেন; কিন্তু লেখেন না। পালাবদলের মাসুম ভাই আমাকে দেখে বললেন, যান, স্যার ভেতরে আছেন। তিনি তো খুব খোশমেজাজে আছেন দেখলাম। সালাম বিনিময়ের পর প্রথমেই বললেন, কী খাবেন, কন। আমি বললাম, চা হলেই চলবে। তিনি বললেন, আরে, রাজশাহী থেকে একজন কবি এসেছে, খালি চায়ে হয় নাকি। মাসুমকে বললেন, শিগগির গরম তন্দুর রুটি আর শিক কাবাব নিয়ে আসো। মাসুম চলে গেলে তিনি জানতে চাইলেন, আমি এ অসময়ে কোথা থেকে এসেছি। আমি তাঁকে সারা দিনের ফিরিস্তি শোনালাম। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আপনি ওই লোকের কাছে গেছেন বই প্রকাশ করতে। তাকে তো আপনি চেনেন না। সে হলো বিশ্ব টাউট। ততক্ষণে নাস্তা এসে গেছে। নাস্তা করার পর তিনি বললেন, সে কত টাকা চাইলো? আমি বললাম, তিনি কত টাকা চান তা বলেননি। তবে আমি ভাবছি, তার প্রকাশনী থেকে বই করবো না। আমার কিছু টাকা আছে। ভালো প্রকাশনী পেলে টাকাগুলো দিতাম। তিনি বললেন, কত টাকা আছে? আমি বললাম, চার হাজার টাকা, আমার বৃত্তির টাকা। তিনি বললেন, দেখি আপনার টাকা। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ভাবলাম, উনি হয়তো রসিকতা করছেন। আমি পকেট থেকে টাকাগুলো বের করে তাঁর হাতে দিলে উনি তা ড্রয়ের ভেতরে রেখে দিয়ে বললেন, আপনার পাণ্ডুলিপি দেন। আমি তাঁর হাতে পাণ্ডুলিপি তুলে দিলাম। তিনি মাসুমকে ডেকে বললেন, এক্ষুণি পাণ্ডুলিপিটি কম্পোজ করতে দাও। উনি যেন সকালে এসে প্রুফ কফি নিয়ে যেতে পারেন। আর আমাকে বললেন, “আপনি ঢাকায় আরো দুদিন থেকে গিয়ে আপনার কবিতার প্রুফ দেখে ফাইনাল করে দিয়ে যান। পালাবদল প্রকাশনীই আপনার বই করবে। আমরা ইতোমধ্যে আরো কিছু বই করেছি। তা, কাকে দিয়ে প্রচ্ছদ করাবো বলেন।” আমি তো একটা ঘোরের মধ্যে আছি তখন। কিছুই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। আমি বললাম, আমার কাছে প্রচ্ছদ করা আছে। প্রচ্ছদটি আমার সাথেই ছিলো। ফাইল থেকে মোমিন উদ্দীন খালেদের প্রচ্ছদটি বের করে তাঁর হাতে দিলাম। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ উচ্ছল হাসি দিয়ে বললেন, চমৎকার প্রচ্ছদ। তিনি সেটি মাসুমের হাতে তুলে দিলেন। বললেন, এক মাসের মধ্যে যেন বইটা হয়ে যায়। আমার তখন বিশ্বাস হতে শুরু করলো, তাহলে শেষ পর্যন্ত আমার বই হচ্ছে। যখন চলে যাওয়ার সময় হলো, সালাম ভাই আমাকে কাছে ডাকলেন। দাঁড়িয়ে বললেন, রাজশাহী থেকে এলেন অথচ কোলাকুলি করা হলো না এখনও। আবারও তার সেই স্বভাবসুলভ হাসি। কোলাকুলির পর তিনি আমার হাতের ভেতর আমার দেওয়া সেই চার হাজার টাকা গুঁজে দিলেন। আমি অবাক হয়ে বললাম ,কী ব্যাপার, টাকা ফেরত দিচ্ছেন যে! তিনি বললেন, হায় রে কবি! সায়ীদ আবুবকরের বই করতে আবার টাকা লাগবে নাকি! আমার দুচোখ ছলছল করে উঠলো।
তারপর তো বই হয়েই গেল। একটা পয়সা লাগলো না। যেই দেখলেন, বললেন, সুন্দর। কবি ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দকে আমার বই দিলে তিনি বইয়ের নাম দেখেই চমকে ওঠেন। পালাবদল অফিসে বসেই তিনি বইয়ের অনেকগুলো কবিতা পাঠ করেন। পাঠ করার পর সালাম ভাইকে বলেন, এ তো পা থেকে মাথা পর্যন্ত কবি। সালাম ভাই এসব কথা , আমি ঢাকায় গেলে, আমাকে জানান।
প্রণয়ের প্রথম পাপ-এর অনেক জনপ্রিয়তার কথা আমি শুনতে পাই। কবি নিয়াজ শাহিদী কানাডায় আছেন। তাঁর এক ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
নিয়াজ শাহিদী জানান, তার ভাই ওই সময় আমার প্রণয়ের প্রথম পাপ ২০ কপি কিনেছিলেন; কারণ যখনই বাসায় আমার এ বইটি নিয়ে আসেন কেউ না কেউ এসে তা নিয়ে যায়। প্রণয়ের প্রথম পাপ-এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের করে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ ২০০৮ সালে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দ্বিতীয় সংস্করণও শেষ হয়ে যায়।
পাঠকে বই খুঁজতে থাকে। কিন্তু প্রকাশক পাওয়া যায় না। শেষপর্যন্ত এবারের বইমেলায় এর তৃতীয় সংস্করণও বের হলো। পাঠকের এখন বই পেতে আর সমস্যা হবে না।। সত্যি বলতে কী, প্রণয়ের প্রথম পাপ-এর কবি বলেই অনেকে চেনেন আমাকে সারা দেশে। আমার প্রথম বই, ভরা যৌবনের ফসল, কোনো কৃত্রিমতা নেই, আড়ষ্টতা নেই, একবারে ঘোরের মধ্যে রচিত, স্বতঃস্ফূর্ত সৃজন যাকে বলে; টসবগে যৌবনের সেন্দৈর্যই আলাদা, অস্বীকার করার জো নেই।