আল পারভেজ
সময়ের চক্র পেরিয়ে আবার এসেছে পবিত্র মাহে রমযান। ২০২৬ সালের এই বসন্ত-নিশীথে যখন একফালি রূপালি চাঁদ আকাশের ললাটে স্মিত করে হেসে ওঠে, তখন মুমিনের হৃদয়ে বেজে উঠে এক অলৌকিক সুর। রমযান কেবল না খেয়ে থাকার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এ এক দহনকাল যে দহনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় নফসের আবর্জনা, আর খাঁটি সোনার মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠে মানবিকতা। রমযান আমাদের সামনে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা হয়ে আসে না, বরং আসে আত্মিক পুনর্জাগরণের এক মহিমান্বিত সুযোগ হিসেবে।
রমযানের মূল সুরটি বেজে উঠেছে আল-কুরআনের অমিয় বাণীতে। সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (খোদাভীতি) অর্জন করতে পারো।”
এই ‘তাকওয়া’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে রমযানের পূর্ণাঙ্গ দর্শন। এটি কেবল পাকস্থলীর উপবাস নয়, বরং এটি চোখের রোজা, কানের রোজা এবং হৃদয়ের রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ভাষায়Í “যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাব (আত্মবিশ্লেষণ) সহকারে রমযানের রোজা পালন করে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়” (সহিহ বুখারি)।
একজন ভাবুক যখন এই হাদিসটি পাঠ করেন, তখন তিনি অনুধাবন করেন যে, ‘ইহতিসাব’ বা আত্মবিশ্লেষণ হলো নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনে নেওয়া। রমযান আমাদের শেখায় যে, উপবাসের তৃষ্ণায় যখন বুক ফেটে যায়, তখন যেন আমরা অনুভব করি সেই নিঃস্ব মানুষের হাহাকার, যাদের জীবন কাটে অনাহারে। এখানেই ধর্ম মিলে যায় মানবতার মোহনায়।
বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখি, জালালুদ্দিন রুমি রমযানকে দেখেছেন আত্মার খোলস পরিবর্তনের ঋতু হিসেবে। রুমি বলতেন, “মানুষের পাকস্থলী যখন রুটির গন্ধে ম ম করে, তখন আত্মার ক্ষুধা মরে যায়। আর যখন পাকস্থলী খালি থাকে, তখন আত্মা আল্লাহর নূরের সন্ধান পায়।” পারস্যের মহাকবি শেখ সাদী তাঁর ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’ কাব্যে সংযম ও দানশীলতার যে মহিমা গেয়েছেন, তার মূলে ছিল এই সিয়ামের শিক্ষা।
শায়েরি বা উর্দু কবিতায় রমযান নিয়ে চমৎকার সব পঙ্ক্তি পাই। কোনো এক কবি লিখেছিলেনÍ
“ইয়ে রামাদান কি বরকাতেঁ হ্যায় জো হার সু নূরের বারিষ হ্যায় / গুনাগারোঁ কি মাগফিরাত কি আল্লাহ সে গুজারিশ হ্যায়।”
(এ রমযানের বরকত যে চারদিকে নূরের বৃষ্টি হচ্ছে, আর গোনাহগারদের ক্ষমার জন্য আল্লাহর কাছে মিনতি জানানো হচ্ছে।)
ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যেও রমযান ওঈদের এক আধ্যাত্মিক আবহ ফুটে উঠেছে, যেখানে তিনি নিস্তেজ সমাজকে জাগিয়ে তোলার জন্য রমযানের তাকওয়াকে পাথেয় করতে চেয়েছেন।
২০২৬ সালের এই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রজন্মের (এবহ ত এবং অষঢ়যধ) ধর্মভাবনা এক কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনার দাবি রাখে। আজকের তরুণদের কাছে রমযান একদিকে যেমন ঐতিহ্যের শিকড়, অন্যদিকে তা আধুনিক জীবনযাত্রার এক কঠিন পরীক্ষা।
বর্তমান প্রজন্মের বড়ো একটি অংশ ধর্মের যান্ত্রিক ব্যাখ্যার চেয়ে আধ্যাত্মিক ও মানবিক ব্যাখ্যায় বেশি আগ্রহী। তারা কেবল ক্যালরি মেপে ইফতার করে না, বরং ‘চ্যারিটি’ বা পরোপকারে তাদের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তারা যাকাত সংগ্রহ, ছিন্নমূল মানুষের জন্য ইফতার আয়োজন এবং ইকো-ফ্রেন্ডলি বা ‘গ্রিন রমযান’ পালনে উৎসাহ দেখাচ্ছে। তাদের কাছে ধর্ম এখন কেবল মাসয়ালা-মাসায়েলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ‘সোশ্যাল জাস্টিস’ বা সামাজিক ন্যায়বিচারের হাতিয়ার।
মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। যন্ত্রনির্ভর এই সময়ে রমযান অনেক ক্ষেত্রে ‘শো-অফ’ বা লোকদেখানো উৎসবে পরিণত হচ্ছে। ইফতারের আধ্যাত্মিক মুহূর্তের চেয়ে দামি রেস্তোরাঁর ‘ইফতার প্ল্যাটার’-এর ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা অনেক তরুণের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাহরির সময় জেগে থাকাটা ইবাদতের চেয়ে ‘নাইট আউল’ সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির এই মায়াজালে পড়ে আমরা অনেক সময় রমযানের সেই নির্জনতা বা ‘নিভৃত ধ্যান’ হারিয়ে ফেলছি, যা আমাদের পূর্বপুরুষরা অর্জন করতেন।
তবে একজন চিন্তাশীল মানুষের দৃষ্টিতে, এই প্রজন্মের ধর্মভাবনা অনেক বেশি যৌক্তিক। তারা প্রশ্ন করতে শেখে। কেন রোজা রাখব? কেন অভাবীকে দেব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যখন তারা কুরআন-সুন্নাহ এবং বিজ্ঞানের আলোকে পায়, তখন তাদের বিশ্বাস আর অন্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রজ্ঞাময়।
২০২৬ সালের রমযানে আমাদের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে ‘ডিজিটাল ফাস্টিং’। হাতের স্মার্টফোনটি যখন ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায়, তখন বুঝতে হবে আমাদের আত্মার চেয়ে যন্ত্র শক্তিশালী হয়ে গেছে। একজন সাহিত্যিক যেমন তাঁর কলম দিয়ে হৃদয়ের ক্ষত নিরাময় করেন, রমযানকেও তেমনি ব্যবহার করতে হবে জীবনকে নতুন করে লেখার জন্য।
রমযান আমাদের শেখায় ‘সবর’ বা ধৈর্য। এই দ্রুতগতির যুগে, যেখানে মানুষ এক সেকেন্ডের লোডিং টাইমে বিরক্ত হয়, সেখানে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষার শিক্ষা আমাদের মানসিক স্থিরতা দান করে। এটিই বর্তমান প্রজন্মের জন্য সবথেকে বড় দাওয়াই।
রমযান ২০২৬ হোক আমাদের জন্য এক দর্পণ। যে দর্পণে আমরা আমাদের কদর্যতাকে দেখব এবং ত্যাগের আবীর দিয়ে তা মুছে ফেলব। সিয়ামের এই দীর্ঘ পথচলা যেন কেবল তৃষ্ণার্ত দুপুর আর ক্ষুধার্ত বিকেলের গল্প না হয়; বরং তা যেন হয় এক আলোকিত মানুষের গল্প।
কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “ইসলাম বলে সকল মানুষ সমান, কেউ নয় পর/ ভাই বলে ডাকি শত্রুরে মোরা, প্রেম দিয়ে জিতি ঘর।” রমযানের শেষে যে ইদ আসবে, তা যেন কেবল নতুন পোশাকের ঔজ্জ্বল্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সেই খুশির চাঁদ যেন প্রতিটি গৃহহীন মানুষের ঘরে একমুঠো অন্ন আর এক চিলতে হাসি নিয়ে আসে।
সাহিত্যের রসাস্বাদন আর ধর্মের সুশৃঙ্খল বিধানÍএই দুইয়ের মেলবন্ধনে আমাদের জীবন হয়ে উঠুক কাব্যময়। যন্ত্রের এই শহরে হৃদয়ের স্পন্দন ফিরে আসুক তসবিহ’র দানায়, মোনাজাতের আকুলতায় আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায়। ২০২৬ সালের পবিত্র রমযান আমাদের জীবনে বয়ে আনুক সেই পরম প্রশান্তি, যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাব্বুল আলামিন।
তথ্যসূত্র ও টীকা:
১. আল-কুরআন: সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩।
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯০১, ৩৮ (সিয়াম অধ্যায়)।
৩. নজরুল রচনাবলি: ‘রমযানের ওই রোজার শেষে’ ও ‘মহরম’ কবিতা।
৪. মছনবী-এ-রুমী: জালালুদ্দিন রুমি (অনুবাদ অংশ)।