আসাদুজ্জামান খান মুকুল
গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি ছনের ঘর। সামনে ধানখেতগুলো যেন সবুজের এক সমুদ্র। ভোরের কুয়াশা কাটলে ধানের মাঠটা সোনালি আলোয় ঝিলমিল করত। দূরে পাখিদের কিচিরমিচির। এমন পরিবেশে রাশেদ আর মনিরা বেড়ে উঠেছে।
তাদের শৈশব ছিল হাসিখুশি আর দারিদ্র্যের এক অদ্ভুত মিশেল। খুনসুটিতে কাটত অনেকটা সময়। স্কুল থেকে ফেরার পথে ‘কে আগে পৌঁছায়’ বলে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামত তারা। খেলার মাঠে মনিরা হোঁচট খেলে রাশেদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি সবসময়ের ভরসা ছিল। বিকেলের নরম রোদে গুড়-মুড়ি খেতে খেতে কত যে গল্প করে যেত।
সংসারের অবস্থা ভালো ছিল না। বাবা অসুস্থতা নিয়ে গম্ভীর মুখে কাজ করতেন আর মা মানুষের কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করতেন। রাশেদের পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল প্রবল। শিক্ষকরা বলতেন, “এই ছেলেটার হাত ভালো, সুযোগ পেলে কিছু একটা করবে।” কিন্তু সেই সুযোগ আর এল না। অষ্টম শ্রেণি শেষ হওয়ার আগেই বাবার শরীর বেশি খারাপ হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে পড়ল। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে দিনমজুরি করা ছাড়া উপায় ছিল না।
একদিন মনিরা যখন জানতে পারল রাশেদ আর পড়বে না, তার বুকটা ভেঙে গিয়েছিল। সে চোখ মুছতে মুছতে বলল—
“ভাইয়া, পড়া ছেড়ে দিবি নাকি? তুই তো..... তুই তো সবার সেরা ছিলিৃ....”
রাশেদ হেসে উত্তর দিল—
“আমার পড়া না হলে কিছু হবে না। তুই পড়বি। আমি খেটে হলেও তোকে পড়াব।”
কথাটা বলার সময় তার চোখে যে শূন্যতার ভাব, সেটা মনিরার চোখ এড়াল না। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের কথা সে মুখে আনেনি।
শৈশবের পরপরই রাশেদের জীবনে এক অপ্রত্যাশিত সুযোগ আসে। শহরের এক আত্মীয় তাকে গ্যারেজে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেখানে সে শুধু কাজই পেত না, বরং তার কারিগরি দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পেত। রাশেদ সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল। সে জানত, সে চলে গেলে অসুস্থ বাবা এবং মায়ের কাছে মনিরা একা হয়ে যাবে। সে তার নিজের স্বপ্নের বদলে পরিবারের সুরক্ষার দায়িত্ব বেছে নেয়।
সময় গড়িয়ে মনিরা বড় হলো। সে সব পরীক্ষায় ভালো ফল করত। রাশেদ রাতে তার পাশে কুপি জ্বালিয়ে পড়াত। মাঝে মাঝে সে কাজে এতটাই ক্লান্ত থাকত যে চোখ বুজে আসত। কিন্তু মনিরার দিকে তাকালেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। নিজের জন্য নতুন জামা না কিনে পকেটে জমানো টাকা দিয়ে বোনের জন্য বই কিনে আনত।
এসএসসি পরীক্ষার সময় ঘরে একেবারে টানাটানি। চাল, মসলা ফুরিয়ে গেছে, বাবার ওষুধ কেনার টাকা নেই। মনিরার চোখে ভয়। সে দেখল, রাশেদ কেমন অস্থির হয়ে আছে। এক রাতে সে দেখল, রাশেদ একটি পুরোনো টিনের কৌটা নিয়ে বাবার কাছে বসে আছে। তার মনে হলো, কিছু একটা ঠিক নেই। পরদিন শুনল, তাদের সামান্য জমিটুকু বিক্রি হয়ে গেছে। সেই টাকা থেকে মনিরার পড়াশোনা, বাবার চিকিৎসা এবং সংসার চলছিল। টাকা ফুরিয়ে গেলে রাশেদ স্থানীয় একটি গ্যারেজে দিন-রাত কাজ করা শুরু করল।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। এক রাতে রাশেদের গ্যারেজে আগুন লাগে। তার সব জমানো টাকা ছাই হয়ে যায়। সে নিজেও মারাত্মকভাবে আহত হয়। আগুনে পোড়া গ্যারেজের ধ্বংসস্তূপে পড়ে যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, তার চোখের সামনে শুধু মনিরার মুখ ভাসছিল। সে নিজেকে বলছিল—
“আমি যদি বেঁচে থাকি, মনিরাকে পড়াতে পারব।”
সেই এক চিলতে আশা তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনল।
মনিরা যখন রাশেদের দুর্ঘটনার খবর পেল, সে এতটাই স্তব্ধ হয়ে গেল যে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। হাসপাতালে ব্যান্ডেজে মোড়া ভাইকে দেখে তার ঠোঁট কাঁপছিল।
“ভাইয়া, আমি আর পড়ব না,” সে ফিসফিস করে বলল, “তুমি এত কষ্ট করছ, আমি কী করে পড়ব?”
রাশেদ ক্ষীণ স্বরে হাসল। ব্যান্ডেজে মোড়া হাতটা কাঁপছিল, কিন্তু বোনের হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
“আমার এই কষ্ট কিছু না, যদি তুই তোর স্বপ্ন পূরণ করতে পারিস। তুই পড়বি, এই আমার শেষ কথা।”
মনিরার চোখে পানি থাকলেও তার মনে এক অদম্য শক্তি এল। সে রাশেদের অপূর্ণ স্বপ্নকে নিজের করে নিল।
মনিরা শুধু পড়াশোনা শেষ করে শহরে একটি ভালো চাকরি পেল। কিছু বছর পর পরিশ্রমে জমানো অর্থ আর দাতা সংস্থার সহায়তায় সে গ্রামে ফিরে স্কুল প্রতিষ্ঠা করল। স্কুলের নাম রাখল—
“রাশেদ স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়”।
সেই স্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মনিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাশেদের ত্যাগের কথা বলল। কীভাবে তার ভাই নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে তাকে মানুষ করেছে, কীভাবে সেই আগুন আর দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে চলছে। রাশেদ সেদিন অনুষ্ঠানে বসে বোনের দিকে দেখছিল, তার চোখ পানি ভরা, কিন্তু মুখে প্রশান্তির হাসি।
বছরের পর বছর কেটে গেছে। ঈদ বা কোন উৎসবে যখনই তাদের দেখা হয়, শৈশবের গল্পে ফিরে যায়। কুয়াশা ভেজা ভোর, ধানের মাঠ, বৃষ্টিতে খেলা, গাছতলায় হাসাহাসি, পুকুরে সাঁতার-সব যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
শত প্রতিকূলতা, শত দুঃখ-দুর্শার মাঝেও তারা কখনো আলাদা হয়নি। সুখ-দুঃখের প্রতিটি মুহূর্তে ভাই-বোন একে অপরের পাশে থেকেছে।
এক বিকেলে তারা সেই একই শৈশবের মাঠে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল। রাশেদ বলল—
“মনে আছে, ছোটবেলায় আমরা এখানে বসে গুড়-মুড়ি খেতাম?”
মনিরা হেসে বলল—
“হ্যাঁ, আর তুই সবসময় আমার ঝামেলা সামলাতি।”
তারা অনেক স্মৃতির ভেতর ডুব দিল। সূর্যটা নামছিল মাঠের ধারে। তারপর দুজনেই চুপ করে বসে রইল অনেকক্ষণ। এই নীরবতার ভেতরেই যেন অনুভব করছিল— এর নামই রক্তের বাঁধন, যা কখনো ভাঙার নয়।