বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

দেশে বর্তমানে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে সরকারি পর্যায়েই ঐকমত্য নেই। একমত নয় এর সংজ্ঞা নিয়েও। কখনো বলা হচ্ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৩৫ লাখ। আবার বলা হচ্ছে এই সংখ্যা ১৭ লাখ ৮০ হাজার। তবে এর মধ্যে ১০ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত বলে উভয় পক্ষই উল্লেখ করে থাকেন। এর মধ্যে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ক্ষতিকর কাজে যুক্ত শিশুশ্রমের হারও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২২ সালে তা কমে হয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু। তবে একই সময়ে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শ্রমে যুক্ত থাকার সামগ্রিক হার ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। ইউনিসেফ বলছে, পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে গত দুই দশকে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়ায় বাংলাদেশের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সঠিক গতিতে নেই বাংলাদেশ। ইউনিসেফের মতে, শ্রমে যুক্ত অধিকাংশ শিশু কাজ করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হলে বাংলাদেশের জরুরি ভিত্তিতে দরকার স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উদ্যোগ হাতে নেয়া।

প্রকৃত সংখ্যা কতো?

দেশে শিশু শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা কতো- তা নিয়ে প্রকৃত হিসেবে গরমিল দেখা যায়। ২০২৫ সালের জুন মাসে শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে এবং ১০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুশ্রম প্রতিরোধে শিশুদের কাজে নিয়োগ করা ব্যক্তিদের শাস্তি কয়েকগুণ বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে পরিবর্তন করা হবে শিশুশ্রমের সংজ্ঞা। নতুন সংজ্ঞায় আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে শিশু শ্রমিকদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে চলতি বছর ৯ জানুয়ারি রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন, দেশে বর্তমানে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমে নিযুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজারের বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই সরকার শিশুশ্রম নির্মূল করতে চায়। শিশু শ্রমিক বলতে এমন শিশুদের বোঝানো হয় যারা তাদের বয়স বা কাজের ধরন অনুযায়ী বিপদজনক বা ক্ষতিকর কাজে নিয়োজিত থাকে, যা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নৈতিক বিকাশে বাধা দেয়। এটি মূলত দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও আইনের প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে ঘটে এবং বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এটি একটি বড় সমস্যা, যেখানে কৃষিকাজ, গার্মেন্টস ও গৃহস্থালীর মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিশুরা কাজ করতে বাধ্য হয়।

শিশুদের শ্রমিক হওয়ার কারণ

শিশুশ্রমের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়, শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা নৈতিক বিকাশের ক্ষতি করে এমন কাজকে শিশুশ্রম বলে। বাংলাদেশ শ্রম আইনে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজে লাগানোকে শিশুশ্রম গণ্য করা হয়। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, ৫-১৪ বছর বয়সী শিশুরা যখন বেতন বা অবৈতনিক উভয় ক্ষেত্রেই সপ্তাহে এক বা একাধিক ঘণ্টা কাজ করে, তখন তাদের শিশু শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষত যখন তা তাদের পড়াশোনা বা স্বাভাবিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায়। শিশুশ্রমের কারণ হিসেবে বলা হয়, পরিবারের আর্থিক অনটন শিশুদের কাজে যেতে বাধ্য করে। স্কুলে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার মান খারাপ হয়। শিশুশ্রম বিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয় না। মালিকদের কম মজুরিতে সস্তা শ্রমের প্রয়োজনে শিশুদের কাজে লাগানো হয়। শিশুশ্রমের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে, কৃষি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণ, গার্মেন্টস, চামড়া ও জুতা শিল্প, লবণ শিল্প, পাট, মোমবাতি, সাবান ও আসবাবপত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি কাজ প্রভৃতি। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের দ্বারা কোনো কাজ করানো কিংবা শিশুদের বিপজ্জনক কাজে নিযুক্ত করা হলে তা শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচিত হয়। শিশুরা যদি এমন কোনো কার্যকলাপে জড়িত থাকে যা তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বা নৈতিক বিকাশে ক্ষতি করে অথবা নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে সেই কাজকে বিপজ্জনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। শিশুদের অধিকার রক্ষায় আইন প্রয়োগ কঠোর করা, দারিদ্র্য হ্রাস ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের শনাক্ত ও উদ্ধার করে তাদের পুনর্বাসন করা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র মতে, শিশুশ্রম হলো এমন ধরনের কাজ, যা একটি শিশুর বয়স এবং কাজের প্রকৃতি অনুসারে নির্ধারিত ন্যূনতম সময়সীমা অতিক্রম করে। আইএলও শিশুদের কর্মসংস্থানকে তিনটি বিভাগে ভাগ করেছে। এগুলো হলো, অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় শিশু, শিশুশ্রম এবং বিপজ্জনক কাজ। ইউনিসেফ শিশুশ্রমকে এমন একটি কার্যকলাপ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা শিশুর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে বিঘিœত করে, শৈশব থেকে তাকে বঞ্চিত করে এবং শোষণ ও অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম অন দ্য এলিমিনেশন অব চাইল্ড লেবার’ অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় শিশুদের সংজ্ঞায়িত করে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে বেতনভুক্ত এবং অবৈতনিক কর্মে নিযুক্ত শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করে, যদিও নিজ পরিবারের জন্য কাজ করা শিশুদের এই সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) গত বছর ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালন করে। আইএলও ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে ওই দিন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রচেষ্টার ফলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশুশ্রমে যুক্ত ছিল, যার মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশুই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। এ কারণে তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।