দ্রব্য মূল্য ভোক্তার নাগালে রাখতে এবং বাজার সিন্ডিকেট ভাংতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছেন ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটরা। সম্প্রতি কয়েকটি অভিযানে গিয়ে কথিত ব্যবসায়িদের কাছে চরম দূর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন তারা। অনেক স্থান থেকে খারপ ব্যবহার পেয়ে অভিযান গুটিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
বিশেষ করে রমজান শুরুর আগের দিন দেশের অন্যতম বড় পাইকারি খাদ্যপণ্যের বাজার পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক তদারকি কর্মকর্তা জরিমানা করেন। এ জরিমানা প্রত্যাহারের দাবিতে ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো ব্যবসায়ীদের নিয়ে মব তৈরি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সারা দেশে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে বলে দাবি করেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজারে অভিযানে বাধা প্রদান ও মার্কেট বন্ধ করার হুমকির প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বাধা প্রদানকারি ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিল ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
গতকাল রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব সামনে ক্যাবের মানববন্ধন থেকে এমন দাবি জানানো হয়। আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট জব্বার মন্ডল অভিযানে গেলে বাধা প্রদানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। ব্যবসায়ী নেতা বারবার দোকান বন্ধের হুমকি দিতে থাকেন। বক্তারা বলেন, চকবাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভূট্টো সরকারি কার্যক্রমে অনৈতিকভাবে বাধা প্রদান করেন। তার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জনগণ ক্ষুব্ধ।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভুঁইয়া বলেন, দেশের সকল ভোক্তার অধিকার রক্ষায় জব্বার মন্ডল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার কাজে বাঁধা প্রদান করায় ক্যাবের পক্ষ থেকে সারাদেশে জেলা শহরে প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধন করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
মানববন্ধন শেষে বাণিজ্য,শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরবার স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, নব নির্বাচিত সরকারের নিকট ব্যবসায়ী মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য ও মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে।
ক্যাবের ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) সামছ্ এ খান বলেন, দেশের ১৮ কোটি জনগণ সকলেই ভোক্তা, ব্যবসায়ীরাও ভোক্তারই একটি অংশ। নতুন সরকারের কাছে তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে বলেন,একজন সরকারি দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে যেভাবে মব সৃষ্টি করে অগ্রাহ্য করা হয়েছে তাতে সাধারণ ভোক্তাদের কি পরিস্থিতি হবে তা বিবেচ্য বিষয়। নতুন সরকারের প্রতি বাজার নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজার তদারকিমূলক অভিযানে বাধা দেওয়া ও মার্কেট বন্ধের হুমকির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এ দাবিতে সংগঠনটি বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে একটি স্মারকলিপি দিয়েছে।
রোববার ক্যাবের সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামানের স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে বলা হয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য তদারকি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এর অংশ হিসেবে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল রাজধানীর চকবাজারের মৌলভীবাজার এলাকায় তদারকিমূলক অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানকালে দেখা গেছে, মেসার্স দেওয়ান ট্রেডার্স মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ছোলার দাম কেজি প্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করে বিক্রি করছে। মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা পণ্য ক্রয়ের মূল্য বেশি হওয়ার দাবি করলেও তার পক্ষে কোনো বৈধ ক্রয়সংক্রান্ত ক্যাশ মেমো প্রদর্শন করতে পারেননি। বরং তারা স্বীকার করেন, পণ্য বাকিতে ক্রয় করে বিক্রির পর মূল্য পরিশোধের সময় ক্যাশ মেমো দেওয়া হয় যা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর পরিপন্থি।
এ অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে আইনটির ৪৫ ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হলে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো প্রকাশ্যে জরিমানা পরিশোধ না করার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি অন্যান্য ব্যবসায়ীদের জড়ো করে হইচই সৃষ্টি, দোকানপাট বন্ধের হুমকি এবং সরকারি কাজে বাধা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে স্মারকলিপিতে। আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করেছে ক্যাব।
ক্যাব মনে করে, এ ধরনের কর্মকান্ড ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে।
ক্যাবের স্মারকলিপিতে ৫ দফা দাবি :
অভিযানে বাধা দেওয়ার ও মার্কেট বন্ধের হুমকিতে জড়িত দোষীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দ্রুত, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। বাজারে তদারকিমূলক অভিযান নির্বিঘœভাবে পরিচালনার জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় সহায়তা নিশ্চিত করা। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর পূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, অস্বচ্ছ লেনদেন ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। ব্যবসায়ীদের পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে বৈধ ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ ও প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং এর ব্যত্যয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, ঢাকাসহ সারা দেশে নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম জোরদার করা।
পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে বাধা এবং ব্যবসায়ী নেতার আস্ফালনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ মামলা না নেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি একে ‘ভয়াবহ অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শুক্রবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আপনি বাংলার নবাব সিরাজুদ্দৌলা হন বা মোঘল সম্রাট আকবর, মেমো বা রশিদ আপনাকে রাখতেই হবে। তাদের কপাল ভালো আমার হাতে পড়েনি।