নির্বাচনী ঢামাঢোলে মধ্যে অশান্তির বাতাস দেখা দিয়েছে দেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে। রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহার কেন্দ্র করে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ, বিজিএমইএ, বিটিএমইএ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে।
সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। দেশের সুতা উৎপাদনকারী মিলগুলোকে রক্ষায় সরকারের ‘কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন তারা।
ঘটনার শুরু হয় চলতি মাসে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় নির্দিষ্ট মানের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের জন্য সম্প্রতিজাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও-২ শাখা এনবিআর ১০ ও ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা বাতিলের জন্য নির্দেশ দেয়।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর নড়েচড়ে বসে পোশাক রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। গত ২০ জানুয়ারি যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করে তারা। ব্যবসায়িরা জানায়, সরকারের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে পোশাকশিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ও গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে । ২১ জানুয়ারি তারা বাণিজ্য উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের অবস্থান জানান দেন।
বৈঠকে উপস্থিত বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন,উপদেষ্টা আমাদের বিষয়টি অনুধাবন করেছেন। তিনি সব তথ্য নেবেন এবং বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করবেন।”
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল বা শুল্ক আরোপের যে উদ্যোগ ছিল, তা হচ্ছে না আমরা মোটামুটি নিশ্চিত। তিনি আরও বলেন, অন্য কোনো পদ্ধতিতে হয়তো সরকার সহায়তা দিতে পারে।
তিনি জানান, বৈঠকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও শিল্পখাতের অবস্থান উপদেষ্টাকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিষয়টি তিনজন স্বাধীন অর্থনীতিবিদের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিকেএমইএ ও বিজিএমইর অবস্থানের পর গতকাল সাংবাদিক সম্মেলন করে বিটিএমএ প্রতিক্রিয়া জানায় ।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘আগামী ১ তারিখ থেকেই ফ্যাক্টরি বন্ধ। আমরা বন্ধ তো করবই, ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই। সরকারি সংস্থাগুলো বুঝেও না বোঝার ভান করছে।
মালিকদের বর্তমান আর্থিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পুঁজি অর্ধেক হয়ে গেছে। ব্যাংকের টাকা পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেও শোধ করা যাবে না।’
সমস্যা সমাধানে সরকারি দপ্তরে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাননি বলে অভিযোগ করেন বিটিএমএ সভাপতি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘সব মন্ত্রণালয়ের সব ডিপার্টমেন্টের কাছে গিয়েছি। তারা কেবল পিলো পাসিংয়ের মতো দায়িত্ব অন্যদের কাছে দিয়ে দিচ্ছে।’
এদিকে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়ার পর তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের তীব্র চাপের মুখে সরকার ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে এমন আভাস পাওয়া গেছে। শিল্পখাতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা রপ্তানি প্রতিযোগিতায় সম্ভাব্য ধাক্কার বিষয়টি তুলে ধরার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন,তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত কার্যকর না করে বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পর্যালোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করতে চায় সরকার। বিটিএমএ’র প্রতিনিধিত্বে টেক্সটাইল মিল মালিকরা আলাদাভাবে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করলেও তাতে তাদের পক্ষে ইতিবাচক কোনো সাড়া মেলেনি।
পোশাক রপ্তানিকারকরা জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকা বেশি দাম দাবি করছে, যা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিট পোশাক খাত থেকে বছরে ২৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসে, যা এখন এই সিদ্ধান্তের কারণে ঝুঁকির মুখে। দেশীয় মিলগুলো উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত সুতা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় আমদানির পথ রুদ্ধ হলে উৎপাদন সিডিউল তছনছ হয়ে যাবে। পোশাক খাতের নেতারা স্পষ্ট জানান, তারা দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বিরোধী নন, তবে সেই সুরক্ষা আমদানিতে বাধা দিয়ে নয় বরং সরাসরি নগদ সহায়তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে দেওয়া উচিত।
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘পোশাক খাত এখন আইসিইউ’তে আছে। পাটের পর এখন পোশাকশিল্প ধ্বংস হবে। স্পিনিং ভালো একটি খাত। কিন্তু তাদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে অন্যদের ক্ষতি করলে তো হবে না। শুধু সুতা আমদানি বন্ধ করে স্থানীয় শিল্প রক্ষার কথা বলেন, কিন্তু শিল্পের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের কোনো খবর নেই। প্রতিবেশী ভারতের কথা বলা হচ্ছে। তারা নিজেদের সুরক্ষায় নগদ সহায়তা থেকে শুরু করে শিল্পের প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। আর আমরা দিনকে দিন সহায়তা কমিয়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
বিজিএমইএ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, ‘বিশ্ববাজারের মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ করার অর্থ হলো দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে জেনেশুনে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।’
তিনি বলেন একটি বিশেষ খাতের পদ্ধতিগত অদক্ষতাকে আড়াল করতে গিয়ে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে থাকার যে খতিয়ান দেওয়া হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধানে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ বলেন, ‘বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো বাস্তব সুবিধা পাচ্ছে না। বরং এই সুবিধার মূল ভোগী হচ্ছে বিদেশি ক্রেতারা। অন্যদিকে, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেও পার্শ্ববর্তী দেশের সরকারের দেওয়া প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ সেন্ট ভর্তুকির কারণে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যেসব সুতা শতভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলো বন্ড সুবিধার বাইরে আনার সক্ষমতা দেশের মিলগুলোর রয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মকর্তা তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন।’
বিটিএমএর সভাপতি বলেন. বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ইয়ার্ন আমদানি করে, যার বড় অংশ আসে প্রতিবেশী ভারত থেকে। দেশের স্পিনিং মিলগুলোর অভিযোগ, ভারত বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার কারণে স্থানীয় বাজারের তুলনায় প্রতি কেজি প্রায় শূন্য দশমিক ৩০ ডলার কম দামে বাংলাদেশে ইয়ার্ন রপ্তানি করছে। এতে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত ইয়ার্ন বিক্রি হচ্ছে না।