যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে হত্যাকা-ের শিকার বাংলাদেশী দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির লাশ দেশে পাঠাতে মায়ামিতে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সিবিএস, ট্রাম্প বে টাইমস।
গত শুক্রবার হিলসবরো কাউন্টি পুলিশ ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে জামিল আহমেদ লিমনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে।
তবে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের (পুলিশ) কার্যালয় থেকে গত রোববার জানানো হয়েছে, ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পিনেলাস কাউন্টি থেকে একটি লাশের খ-াংশ উদ্ধার করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পুলিশ বলেছে, লাশের খ-িত অংশগুলো বর্তমানে পিনেলাস কাউন্টি মেডিক্যাল এক্সামিনারের দপ্তরে রাখা হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে দেহাবশেষের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিল ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশী পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হন। দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস এবং মায়ামির বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিহত শিক্ষার্থীদের শোকার্ত পরিবারের সঙ্গেও দূতাবাস, কনস্যুলেট ও মন্ত্রণালয় থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হয়েছে।
মার্কিন তদন্ত সংস্থা হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক মার্কিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফাস্ট ডিগ্রি) হত্যা মামলা করা হয়েছে।
দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, তদন্ত সক্রিয়ভাবে চলমান থাকায় শেরিফ কার্যালয় এ মুহূর্তে তদন্তসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে অপারগতা জানিয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপগুলো সরাসরি পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হবে মর্মে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশী দূতাবাস ও কনস্যুলেট জেনারেল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও বসবাসরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গেও দূতাবাস নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিহত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী বৃষ্টির দেহাবশেষ উদ্ধার
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ট্যাম্পা বে এলাকার জলপথ থেকে নিখোঁজ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টির লাশ খ-িত অংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কয়েক দিন ধরে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার এই পিএইচডি গবেষককে খুঁজে বের করতে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছিল।
গত রোববার গভীর রাতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ তথ্য নিশ্চিত করে। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ পিনেলাস কাউন্টির একটি স্থানে পাওয়া যায়। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের দপ্তরের তথ্যমতে, ইন্টারস্টেট ২৭৫ ও ফোর্থ স্ট্রিট নর্থের কাছাকাছি এলাকা, যা হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের সেন্ট পিটার্সবার্গ অংশের কাছে, সেখান থেকেই এটি উদ্ধার করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে জামিল লিমন নামে আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে নিখোঁজ হন বৃষ্টি। পরে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ট্যাম্পার কাছাকাছি একটি সেতুর ওপর থেকে লিমনের বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনার পর লিমনের ২৬ বছর বয়সি রুমমেট হিশাম আবুগারিবেহকে আটক করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ পরিকল্পিতভাবে দুজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে লিমনের দেহ একাধিক কালো ট্র্যাশ ব্যাগের ভেতরে পচনধরা অবস্থায় পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, বৃষ্টির লাশও একইভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
তবে এই নৃশংস হত্যাকা-ের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি পুলিশ।
চ্যাটজিপিটির কাছে কী কী জানতে চেয়েছিলেন সন্দেহভাজন খুনি
কোনো ব্যক্তিকে যদি একটি কালো রঙের আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশী পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার মাত্র ৩ দিন আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকে এ প্রশ্ন করেছিলেন হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ।
বাংলাদেশী দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকা-ে সন্দেহভাজন হিসেবে মার্কিন নাগরিক আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা ক্যাম্পাসের বাইরে লিমনের সঙ্গে একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন আবুঘরবেহ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার পর ফরেনসিক দল লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে যায় এবং সেখানে তারা রক্তের চিহ্ন খুঁজে পায়। ওই কমপ্লেক্সের ভেতর আবর্জনা রাখার জায়গায় তাঁরা লিমনের মানিব্যাগ ও চশমা এবং একটি গোলাপি রঙের আইফোন কাভার খুঁজে পায়। সেটি নিখোঁজ আরেক শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টির বলে ধারণা করা হয়।
ফরেনসিক দলটি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর রক্তে ভেজা কাপড়ের টুকরাও খুঁজে পায়।
শুক্রবার আবুঘরবেহকে তার পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহর বিচার শুরুর আগপর্যন্ত তাঁকে কারাগারে রাখার অনুরোধ জানিয়ে গত শনিবার তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন।
ওই আবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালতে করা ওই আবেদনে এ দুই হত্যাকা- নিয়ে এখন পর্যন্ত তদন্তে যা কিছু পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কয়েকটি কালো রঙের আবর্জনা ফেলার ব্যাগের মধ্যে লিমনের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের লাশে কোনো কাপড় ছিল না এবং লাশে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তারা আবুঘরবেহর ফোন ঘেঁটে কিছু তথ্য পেয়েছেন। সেই তথ্যানুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে থেকেই আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে একাধিক প্রশ্ন করেছিলেন। ১৩ এপ্রিল করা প্রথম প্রশ্নে তিনি ‘একজন মানুষকে’ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া সম্পর্কে জানতে চান।
নথি অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি এর উত্তরে বলে, এটি ‘বিপজ্জনক শোনাচ্ছে’। এরপর তিনি একটি ফলোআপ বার্তায় জিজ্ঞাসা করেন, ‘তারা কীভাবে জানতে পারবে?’
দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার এক দিন আগে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘একটি গাড়ির যানবাহন শনাক্তকরণ নম্বর (ভিআইএন) কি পরিবর্তন করা যায়?’ এবং ‘লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে কি বন্দুক রাখা যায়?’—এমনটাই ওই আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চ্যাটজিপিটি এসব প্রশ্নের উত্তর কী দিয়েছিল, তা নথিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
তদন্তে পাওয়া অন্যান্য রেকর্ড অনুযায়ী, দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার পর আবুঘরবেহ ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে গাড়ি চালিয়ে কর্নি ক্যাম্পবেল কজওয়ে পার হয়ে স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় যান।
নথিতে উল্লেখ করা হয়, সেই রাতে তাঁর গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার পথের সঙ্গে লিমনের মোবাইল ফোনের সিগন্যালের গতিপথ মিলে যায়। সে সময়ে লিমনের মোবাইলের সিগন্যালের গতিপথ কজওয়ে ও ক্লিয়ারওয়াটারের বিভিন্ন স্থানে শনাক্ত হয় এবং এরপর হঠাৎ সেটির সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়।
শুধু লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার আগেই নয়, বরং তাঁরা নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘কেউ কি স্নাইপারের গুলিতে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর বেঁচে গেছে?’ এবং ‘আমার প্রতিবেশীরা কি আমার বন্দুকের শব্দ শুনতে পাবে?’ নথিতে এমনটাই উল্লেখ আছে।
হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে শুক্রবার উত্তর টাম্পার লেক ফরেস্ট এলাকায় পারিবারিক বাড়ি থেকে সোয়াটের একটি দল আবুঘরবেহকে আটক করে।