ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে আগের প্রশাসকদের সরিয়ে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি। যারা এই পদগুলোতে নিয়োগ পেয়েছেন তাদের সবাই বিএনপির নেতা। এর মধ্যে রয়েছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রাথিতা না পাওয়া নেতা এবং নির্বাচন করে হেরে যাওয়া নেতারা। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘যত দ্রুত সম্ভব’ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছিলেন। তার এ ঘোষণার রেশ কাটতে না কাচতেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি করপোরেশন-১ শাখা) থেকে নতুন প্রশাসকদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হয়।
২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়রদের পদচ্যুত করেছিল। এরপর নিয়োগ দেওয়া হয় প্রশাসক। বিএনপি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর এখন ‘রাজনৈতিক’ প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলো।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন আবদুস সালাম। বিএনপির এই নেতা একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন। ছিলেন ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব। তিনি বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হলেও আবদুস সালাম এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুস সালাম।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন শফিকুল ইসলাম খান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের কাছে হারেন। শফিকুল ইসলাম খান যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ পূর্তির পর এ মাসের শুরুর দিকে সুরাইয়া আখতার জাহানকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন এ পদে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন শফিকুল ইসলাম খান।
জৈষ্ঠ রাজনীতিক নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০২১ সালের আগে দীর্ঘ ২৮ বছর খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ১২ বছর ছিলেন সভাপতি। নজরুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। তবে এবার জিততে পারেননি। জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের কাছে হারেন তিনি। ২০১৮ সালের খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ছিলেন তিনি। এ নির্বাচনে তিনি হেরে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোখতার আহমেদের স্থলাভিষিক্ত হলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
শওকত হোসেন সরকার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। এর আগে টানা ১০ বছর শওকত হোসেন সরকার কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ছিলেন শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন শওকত হোসেন সরকার।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। আলোচিত সাত খুনের মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী ছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগদলীয় প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ৭৮ হাজার ৯৬৭ ভোটের ব্যবধানে তাকে পরাজিত করেন। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে পদচ্যুত সেলিনা হায়াৎ আইভী গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব দিয়েছিল আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে। তার স্থলাভিষিক্ত হলেন সাখাওয়াত হোসেন খান।
সিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ২০২২ সালের ২৯ মার্চ সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত সিলেটে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সমন্বয়কারী ও সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ছিলেন। তিনি বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে মনোনয়ন পাননি। এ আসনে দলের মনোনয়ন পান যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি এম এ মালিক। নির্বাচনে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট জেলার সব কটি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খান মো. রেজা-উন-নবীর স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।