প্রত্যাশার নতুন বাংলাদেশ গঠনে জাতির সামনে ৬টি অঙ্গিকার তুলে ধরেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অঙ্গিকারগুলো জাতির সামনে তুলে ধরতে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পলিসি সামিটের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এতে অংশ নেন রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, কুটনীতিক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বিশেষজ্ঞরা। সম্মেলনে স্¦ স্ব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা আগামীর বাংলাদেশের রোডম্যাপ জাতির সামনে তুলে ধরেন। সেইসাথে অভিজ্ঞজনের পরামর্শ ও উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব দেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তুলে ধরা অঙ্গিকারগুলো উপস্থিত সবার কাছে প্রশংসা পায়।
এদিন সকাল সাড়ে ৮টায় ক্বারী বেলাল হোসাইনের কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সামিট শুরু হয়। এরপর বাংলাদেশ নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। তাতে দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরা হয়। সেইসাথে দেশ গঠনে ৬টি প্রাধান্যের কথা তুলে ধরা হয়। এরমধ্যে ছিল দেশ গঠনের কৌশল, উন্নয়ন পরিকল্পনা, যুব কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, কার্যকর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সামিটে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
এরপর শুরু হয় পলিসি নিয়ে প্রেজেন্টশন সেশন: ‘বাংলাদেশের কৌশল: শাসন কাঠামোর রূপরেখা, শীর্ষক সেমিনারে কি নোট পেপার উপস্থাপন করেন ড. দেওয়ান আলী হায়দার আলমগীর। তিনি বলেন, ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি বাজে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ভোটের অধিকার ছিল না। বৈষম্যে ভরা ছিল সমাজ। আমাদের প্রত্যাশা এবং সম্ভাবনার শেষ নেই। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে সবার উন্নয়ন হবে, কিছু মানুষের নয়। কেউ অবৈধভাবে বেশি উপার্জন করতে পারবে না। প্রাইভেট সেক্টরকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। ভাল সরকার মানে গণতান্ত্রিক সরকার, ক্ষমতার ভারসাম্য। সবকিছুতে সংলাপকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। ভাল অর্থনীতি মানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করণ। রুল বেইজড ইকোনমিক সিস্টেম, দুর্নীতিমুক্ত পদক্ষেপ, অর্থনীতির সংস্কার, মান উন্নয়ন, রফতানির বৈচিত্র, অপচয় কমানো, রেমিটেন্স, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জেলা এবং ছোট শহরের ব্যবস্থাপনা,স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতি।
এসময় দর্শক সারি থেকে করা প্রশ্নের উত্তর দেন প্যানেল আলোচকরা। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে কথা বলেন সাবেক সচিব ড. শরিফুল আলম জিন্নাহ। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার হচ্ছে জনগণের সেবা দেওয়ার প্রথম সরকারী প্রতিষ্ঠান। জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সেবা কেন্দ্র হবে স্থানীয় সরকার। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনবলের অভাব এবং দুর্নীতি এবং রাজনীতির কারণে স্থানীয় সরকার কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
প্যানেল আলোচক ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ভাল সরকারের জন্য দরকার ভাল মানুষ। দুর্নীতি মুক্ত মানুষ। জামায়াত চায় দুর্নীতি মুক্ত মানুষ ও সমাজ। জামায়াতের উদ্দেশ্য ভাল মানুষকে ক্ষমতায়ন করা। নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ ভাল দেশ উপহার দিবে। জেলা পর্যায়ে ভাল হাসপাতাল স্থাপন করা হবে, যাতে ঢাকায় আসতে না হয়।
আলোচনায় অংশ নেন পাবনা থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজিব ওয়াদুদ। তিনি সংস্কার এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও দুর্নীতি বন্ধের কথা জানান। তিনি বলেন, আমরা দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যক্তিকে নির্বাচন করি। ভাল মানুষকে নির্বাচিত করলে সমস্যা সমাধান হবে। আমাদের ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা দরকার। নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর হাফিজুর রহমান বলেন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য দরকার ইনোভেশন বেইসড ইকোনোমি। আরেক প্যানেল আলোচক শাহ আলম বকসি শিক্ষাব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন চান। তিনি ইসলামিক শিক্ষাযুক্ত করার পরামর্শ দেন। সম্মিলিত নারী প্রয়াসের জয়েন্ট সেক্রেটারি নিয়ামা ইসলাম স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর করার পরামর্শ দেন। সেমিনারে প্রফেসর দিলারা চৌধুরী জানতে চান নারীর ক্ষমতায়ন এবং সরকারে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, অর্ধেক নারীকে বাদ দেওয়া যাবে না। তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। জামায়াতে ইসলামী কাউকে নমিনেশন দেওয়া হয়নি কেন ? প্রশ্নের জবাবে ডা. তাহের বলেন পর্যায়ক্রমে আমরা করবো।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর সাইফুদ্দিন বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারে হস্তক্ষেপ করে। পৌরসভায় বরাদ্দ কম। জামায়াত ক্ষমতায় এলে স্থানীয় সরকার সংস্কার করা হবে কি-না।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য জামায়াতে ইসলামী সরকারে গেলে দুর্নীতি প্রতিরোধে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে জানতে চান। সদ্য জামায়াতে যোগ দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর আক্তারুজ্জামান বিদ্যমান দুর্নীতিতে নিয়ন্ত্রণ করতে রাজনৈতিক দুদক তৈরি করা হবে কি-না তা জানতে চান।
সেমিনারে জানানে হয় জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স গ্রহণ করা হবে। সেইসাথে ট্যাক্স-ভ্যাট পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা হবে। চালু করা হবে সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড। আগামী ৩ বছর গ্যাস বিদ্যুৎ পানির দাম বাড়ানো হবে না। ব্যবসাবান্ধব পলিসি তৈরি সহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের জন্য সুধবিহীন সুদ ব্যবস্থার কথা জানানো হয় সেমিনারে।
দ্বিতীয় অধিবেশনে সমৃদ্ধির প্রসার; অর্থনীতি ব্যবসা এবং বিনিয়োগ শীর্ষক সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. ওয়ারেসুল করিম। তিনি জানান জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে প্রাথমিক টিকিৎসা ফ্রি করে দেওয়া হবে। প্রসুতি মায়ের চিকিৎসাও দেওয়া হবে পয়সা ছাড়াই। নতুন বাচ্চাদের যতœ নেওয়া হবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। বাচ্চাদের খাবারও দেওয়া হবে বিনামূল্যে। স্বাস্থ্যব্যবস্থ্যায় আনা হবে প্রভূত উন্নয়ন। বিনামূল্যে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। দেওয়া হবে বৃত্তি ও শিক্ষা ঋণ। বেকার ভাতা দেওয়ার কথা জানানো হয় সেমিনারে। প্যানেল আলোচক ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর এইচ এম মোশাররফ হোসেন বলেন, ৫৪ বছর কোন ডেমোক্রেসি প্র্যাকটিস করা হয়নি। দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। নৈতিক অবক্ষয় ছিল চরম পর্যায়ে। তিনি পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন।
আলোচনা অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সৎ যোগ্য এবং ডায়নামিক নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের পলিসি হবে নারীরা তার নারীত্ব উপভোগ করবে। ছাত্ররা তার ছাত্রত্ব উপভোগ করবে। সেমিনারে প্যানেল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এইচ এম মোশাররফ হোসেন। সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম সারা খান, ড. শিব্বির আহমদ ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ।
যুব কমংসংস্থান; জেনজি এবং আলফা প্রজন্মেও শক্তির বিকাশ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা, আইটি সেক্টরে বাংলাদেশের যুবকদের অপার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তারা জ্ঞানভিত্তিক জনশক্তি গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে এ আই এবং রোবটিক সিস্টেমের কথা তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে ডায়াসপোরাদের সহযোগিতার কথা জানান। সেমিনারে কি নোট স্পিকার ছিলেন ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আজ ১৫ থেকে ২৯ বছরের ২ মিলিয়ন যুবক বেকার। এটি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। দরকার এনার্জেটিক উৎপাদনশীল যুবক। তাদের কাজে লাগাতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা থেকেই যাবে। এটাই বাস্তবতা। তাদের স্কিল্ড করতে পারলে উচ্চ বেতনের কাজ করবে। এদের লো স্কিল থেকে হায়ার স্কিলে নিয়ে যেতে হবে। বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যসত্বভোগী মুক্ত করতে হবে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে যুবকদের ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড স্কিল্ড ম্যানপাওয়ার তৈরির উদ্যোগ নিবে সরকার। বিশ^জুড়ে চাহিদার আলোকে পেশাদার মানুষ নার্স, প্লাম্বার, মিন্ত্রী,কারিগর তৈরি করা হবে। সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো উৎরাতে হবে। না হলে উল্টোটা হবে। নিন্ম মানের কাজ হবে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে কোন যুবক ট্রেনিংয়ের বাইরে থাকবে না বলেও জানানো হয় সেমিনারে। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চিন্তা খুবই পরিষ্কার। যুবক নারী এবং শিক্ষিত বেকারদের ব্যাপারে। যুবকদের বেকারত্ব দুরীকরণে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিবে জামায়াতে ইসলামী। কোন শিক্ষিত বেকার থাকবে না।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, এখনকার যুবকদের প্রশ্ন পড়াশোনার পর চাকুরি পাবে কি-না। বাংলাদেশে আধিপত্যের থাবার কারণে এটা হয়নি। ৩ মিলিয়নের বেশি বেকার নিয়ে জামায়াতে ইসলামী গুরুত্ব দিচ্ছে। চায়না বিশ বছরে বহু এগিয়ে গেছে। ইয়াং জেনারেশনকে নিয়ে ভাবতে হবে। জামায়াত এই যুবককে নিয়ে ভাবছে। আগামির বাংলাদেশ বেকারমুক্ত করার চিন্তা বেশ কার্যকর হবে বলে আশা রাখি।
তরুণেরাই বাংলাদেশের মূল চালিকা শক্তি উল্লেখ করে বক্তারা বলেন আইসিটি সেক্টর আমাদের কর্মক্ষেত্রের বড় জায়গা। তাদের দক্ষ করে তোলাই হউক আমাদের লক্ষ্য। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে যুবকদের দক্ষ করে তুলবে। দর্শক সারি থেকে পরামর্শ দেওয়া হয় ভারত আইসিটি সেক্টরে অনেক এগিয়ে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে ভাল পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন তারা।
সেমিনারে জানানো হয়, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে যুবকরা গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ৫ লক্ষ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা কর্জে হাসানাা দেওয়া হবে। মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে। এছাড়া প্রতিবছর বিশে^র সেরা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ দেওয়া হবে। গরীব মেধাবী সন্তানও যেন হার্ভাড এমআইটি অক্সফোর্ড ক্যামিব্রিজে পড়তে পারে। ইডেন বদরুন্নেসা ও হোম ইকোমিক্স কলেজকে একীভূত করে বিশে^র সর্ববৃহৎ নারী বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনস্ত বড় কলেজগুলোকে বিশ^বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে এবং সকল নিয়োগ হবে মেধাভিত্তিক।
সেমিনারে জানানো হয় দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন করা হবে। প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫০ লাখ জব এক্সেস নিশ্চিত করা হবে। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লক্ষ উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু হবে। দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করা হবে। অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশী প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে। আইসিটি সেক্টর উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট করা হবে।ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন করা হবে।আইসিটি সেক্টর থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করার লক্ষমাত্রা গ্রহণ করা হবে। আইসিটি খাতে সরকারের ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয় লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে।
সেমিনারে প্যানেল আলোচক ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রহমান, মো. আব্দুল্লাহ মাহমুদ, ইঞ্জিনিয়ার বেলাল আহমেদ। সেমিনারের সঞ্চালক ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার তুনাজ্জিনা রহিমু।
সমতা নিশ্চিতকরণ : নারী ও অন্তর্ভূক্তিমূলক কার্যক্রম শীর্ষক সেমিনারে কী নোট উপস্থাপন করেন ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ ও সুমাইয়া রাবেয়া। তিনি তুলে ধরেন কিভাবে দেশের মেয়েরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা থেকে ছিটকে পরে। চাকুরী বিহীন জীবন যাপন করে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পন্থা তুলে ধরা হয় সেমিনারে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগ রাষ্ট্রীয় পলিসি নির্ধারণে বড় একটি সংখ্যা নির্বাচনী মাঠে কাজ করছে বলে জানানো হয়। নারী নির্যাতনে জিরো টলারেন্স পথ অনুসরণ করবে জামায়াতে ইসলামী।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারীদের পুরুষের সমান অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে অঙ্গিকারবদ্ধ। নিরাপত্তা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে সম্মান দেওয়ার বিষয়ে কাজ করবে।
প্যানেল আলোচক ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন বলেন, জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে নারীর সমান অধিকার এবং সম্মানজনক কর্মক্ষেত্র এবং নিরাপত্তার বিষয়ে ইশতেহার দিয়েছে। এবিষয়ে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। প্যানেল আলোচক ছিলেন ড. ফেরদৌস আরা খানম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের এজিএস মেঘলা কিছু প্রশ্ন এবং সুপারিশ রাখেন। জবাবে বলা হয় জামায়াতে ইসলামীর নারীরা ভোটের মাঠে সফলভাবে কাজ করছে। নির্বাচিত হয়েছে। আগামিতে আরও বেশি অংশগ্রহণ দেখা যাবে।
প্রফেসর দিলারা চৌধুরী নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে কিছু কথা বলেন। জবাবে জানানো হয়, নারীর উত্তরাধিকার নিয়ে কাজ করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এব্যাপারে সচেতন করবে মানুষকে। জামায়াতে ইসলামী ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস করবে; যেখানে নারীর অধিকার বিষয়ক আইনি ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করবে।
জামায়াতে ইসলামীর উপস্থাপিত এডুকেশন ফর দ্য ফিউচার; ‘পলিসি ফর চেইঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে হলিস্টিক মডেল এবং একাডেমিক ও নৈতিকতা সম্পন্ন শিক্ষার কথা বলা হয়। সেইসাথে হাতে-কলমে শিক্ষায় জোর দেওয়ার কথা বলা হয়। ক্লাসরুমগুলোকে কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা জানানো হয়। বাড়ানো হবে শিক্ষার বাজেট, মান সম্পন্ন মেধাবী শিক্ষক এবং শিক্ষার মান। এজন্য স্থায়ী শিক্ষা কমিশন করার কথা জানান বিশেষজ্ঞরা। শিক্ষা সংস্কার বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, শিক্ষার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ করে পড়ানোর পদ্ধতিটা পরিবর্তন দরকার। পুরণো ধাঁচের পড়াশোনা এবং পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে।
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপক ছিলেন অধ্যাপক ড. মোকাররম হোসেন। আলোচক ছিলেন ড. কে এম কবিরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. শাখাওয়াত জামান, কর্নেল অব আব্দুল বাতেন, মহসিনা মমতাজ মারিয়া।
‘হেলথ ম্যাটার্স : পলিসি ফর ট্রান্সমেশন’ শীর্ষক সেমিনারে কী নোট উপস্থাপন করেন ডা. হাসান আল বান্না। সেমিনারে বলা হয়,পলিসি পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন আনা যায়। প্রাইমারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জীবন রক্ষার ওষুধ অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন জেলা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর উন্নয়ন। কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধ করা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে নারীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল বানাবে। কল-কারখানার পাশে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করবে। উপজেলা লেবেলের হাসপাতালে জীবন বাচানোর ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা থাকবে। মানসিক হাসপাতাল বানানো হবে সবখানে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা প্রোগ্রাম বাড়ানো হবে। নিশ্চিত করা হবে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন হাসপাতাল। তাতে বিদেশে চিকিৎসা খরচ কমবে। এক কার্ডে সব সেবা থাকবে ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’।
ডক্টর এস এম খালিদুজ্জামান বলেন, আমাদের সব লজিস্টিক সাপোর্ট রয়েছে। কিন্তু কোথায় যেন গ্যাপ রয়েছে। এটি খুঁজে বের করতে হবে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে পলিসি নির্ধারণের মাধ্যমে জাতি ভাল সার্ভিস পাবে। আমরা নিশ্চিত করবো যাতে কোনো রোগীকে বিদেশ যেতে না হয়।
জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবার হাব তৈরি করা হবে। তাহলে আর মানুষ মেগাসিটিতে আসবে না। জামায়াতে ইসলামী স্বাস্থ্যখাতে দুর্র্নীতিকে না করে দেবে। ডাক্তাারিতে গ্যাপ ২০ ভাগ। আবার নার্সে ৮৬ভাগ গ্যাপ। এই গ্যাপগুলো পূরণ করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, সব এমপি দেশে চিকিৎসা নেবে এটা জামায়াত আমীরের অঙ্গিকার। জামায়াতে ইসলামী উদাহরণ তৈরি করবে যে আর কোন রোগী বিদেশে যাবে না। বিদেশ থেকে আসবে। ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে।
‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিটে অংশ নেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, গবেষক, প্রফেশনালস সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, কসোভো, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ব্রুনাই, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, ইরান, কানাডা, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ব্রাজিল, জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইআরআইসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কুটনীতিবিদগণ উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মু. তাহের ও মাওলানা আ.ন.ম. শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ.টি.এম. মা'ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব সাইফুল আলম খান মিলন ও মোবারক হোসাইন। আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির ডিস্টিংগুইসড ফেলো ও প্রথম নির্বাহী পরিচালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের সদস্য প্রশাসন অধ্যাপক ড. এ কে এম সাদরুল ইসলাম, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদ, দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাউদ্দিন বাবর, দ্য নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ডিইউজে-এর সভাপিত ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ডিইউজে-এর সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দ।