বাহিনী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একসময়ে সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত ছিল র্যাপিড আ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। পরবর্তীতে এই বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিরোধী মত দমনে পতিত আওয়ামীী লীগ সরকারের প্রাইভেট বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম, খুন এবং আয়নাঘরে চরম নির্যাতনের অভিযোগে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআর ডব্লিউ)। তারা র্যাবকে একটি “ডেথ স্কোয়াড” হিসেবে উল্লেখ করে এটি পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি জানায়।
এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সংস্থাটির সাবেক ডিজিসহ সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় সম্পদ অবরুদ্ধ করণ এবং মার্কিন ব্যক্তিদের সাথে লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে। পাঁচ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত গুম কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। এছাড়া সম্প্রতি র্যাব বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি লিখেছে ৯ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত বাহিনীটি বিলুপ্তি হচ্ছে না। পরিবর্তন হচ্ছে নাম। শুরু থেকেই এ সংস্থাটির নাম বিভ্রাট থাকলেও একসময়ে অপরাধীদের কাছে র্যাব নামটি ছিল চরম আতঙ্কের। সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ ও জলদস্যুদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল র্যাব। কিন্তু বিগত বছর গুলোতে বাহিনীটির বিরুদ্ধে চরম অভিযোগ ওঠায় সব মহল থেকেই র্যাব নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। সরকারের সিদ্ধান্তে নাম বদলের মধ্য দিয়ে চালিয়ে যাবে বাহিনীটির কার্যক্রম।
প্রতিষ্ঠার সময়ে (২০০৪ সালে) র্যাবের নাম ছিল ‘র্যাপিড অ্যাকশন টিম’ (র্যাট)। পরে বাহিনীটির নাম দেওয়া হয় র্যাব। প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পর এবার আরও একবার নাম পরিবর্তন হচ্ছে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের নিয়ে গঠিত বিশেষ এই বাহিনীর। ব্যাপক আলোচিত এই বাহিনীটির ২২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী আজ ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার।
২০০৪ সালে স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে অংশ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে র্যাব। ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছর দিনটিকে ‘রেইজিং ডে’ হিসেবে পালন করে আসছে বিশেষ এই এলিট ফোর্স। বর্তমানে র্যাবের নাম স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ (এসআইএফ) করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্তমানে বাহিনীর মহাপরিচালকের (ডিজি) দায়িত্ব পালন করছেন আহসান হাবীব পলাশ। প্রতিষ্ঠার পর সাংগঠনিক কর্মকা- ছাড়াও স্ব-স্ব এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ শুরু করে র্যাব। প্রায় তিন সপ্তাহ পর ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) রমনা বটমূলে নিরাপত্তা দিয়ে র্যাব তাদের কার্যক্রম শুরু করে। একই বছরের ২১ জুন পূর্ণাঙ্গভাবে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করে বাহিনীটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে র্যাবের জনবল ও ব্যাটালিয়নের সংখ্যা।
বর্তমানে সারাদেশে এ এলিট ফোর্সের ব্যাটালিয়ন সংখ্যা ১৫টি। যেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার ও সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের বাছাই করা চৌকস কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জীবনবাজি রেখে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফেরাতে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে সংস্থাটি। র্যাব দেশে অপরাধ দমনে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। ২০০৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ টানা ৩৩ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন জামআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) আমির শায়খ আব্দুর রহমানকে সিলেটের শাপলাবাগ থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। প্রতিষ্ঠার পর এটিই ছিল র্যাবের সবচেয়ে আলোচিত অভিযান ও সবচেয়ে বড় সাফল্য। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে জঙ্গি সংগঠন জেএমবি তাদের শক্তি জানান দেওয়ার পরপরই মাঠে নামেন র্যাব গোয়েন্দারা। এরপর গ্রেফতার করা হয় সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান সানিসহ শত শত অপরাধীকে। তবে জঙ্গি দমনের নামে বিভিন্ন সময় দেশের অসংখ্য আলেম ওলামা, পর্দানশীন নারীদের গ্রেফতার নির্যাতন ও গুম-খুন ও এবং আয়নাঘরে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ঘটনার এখনো তদন্ত চলছে।
বিলুপ্তি চেয়ে চিঠি: র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি লিখেছে ৯ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। সম্প্রতি হিউমান রাইটস ওয়াচ, অ্যামিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফর্টিফাই রাইটস, আর্টিকেল নাইনটিন, সিপেজি, সিভিকাসসহ ৯টি সংগঠন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ চিঠি পাঠিয়েছে। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও এই চিঠি পাঠিয়েছে সংগঠনগুলো। চিঠিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপি সরকারের সামনে নানা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে, এই সময়টিকে মানবাধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। তার পতনের পর এসব ঘটনার অনেকটাই কমে এলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ইচ্ছামতো আটক এবং সাংবাদিক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার মতো ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
নতুন নাম হচ্ছে ‘এসআইএফ’: গত ৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে জানানো হয় র্যাবের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাহিনীটির নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ (এসআইএফ)। এই সিদ্ধান্তের কথা জানান সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা অনুমোদন দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তাদের কাজের মানে এরই মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। অনেকের দাবি ছিল র্যাবের নাম পরিবর্তন করা হোক। তাই নতুন নামকরণ করা হয়েছে। উপদেষ্টা বলেন, বাহিনীটির পোশাকও পরিবর্তন করা হতে পারে।