গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকার পতনের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা চাঁদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে দেশ। বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব । বিশেষ করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হওয়া আজকের (বৃহস্পতিবার) ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নির্ভয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে এসে ভোট দেয়ার ওপর নির্ভর করছে নির্বাচ সুষ্ঠু হওয়ার মানদন্ড। এই বিষয় মাথায় রেখে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় সাড়ে ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রাজধানীসহ সারাদেশকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে নিরাপত্তা ছক তৈরি করা হয়েছে। রয়েছে পোশাকের পাশাপাশি সাদাপোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি। ডগ স্কোওয়াড, সোয়াদ টিম, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটসহ তৎপর রয়েছে চৌকস টিম। এছাড়াও সারাদেশে ২৫ হাজার ৭০০ বডি-ওর্ন ক্যামেরাসহ মোতায়েন পুলিশ সদস্যরা। সিসিটিভিসহ রয়েছে ড্রোন দিয়ে বিশেষ নজরদারি। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে- মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য প্রস্তুত আছে।

তবে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকার পরও একটি পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ আসছে। গত কয়েকদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। মঙ্গলবার রাতেও জামায়াত আমীরের আসনে নির্বাচনী অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের পর আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এমন অভিযোগ করে জানিয়েছেন, ঢাকা-১৫ আসনে প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটছে। জামায়াত টাকা বিলি করছে ও বিকাশ নম্বর নিচ্ছে- এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে লিফলেট বানিয়ে সেগুলো ছড়ানো হয়েছে। আমীরসহ সার্বিকভাবে জামায়াতের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে একদল অসৎ লোক এসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ভোটকে ঘিরে সারাদেশে ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সহায়তায় থাকছে প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্য এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও হাজারো সদস্য। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।

গত মঙ্গলবার সাংবাদিক সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানান, দেশের ২৯৯টি আসনের ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, দেশের ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্রকে সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৬ হাজার কেন্দ্রকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু কেন্দ্র অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। যেখানে নির্বাচনের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈরিতা বিরাজ করছে। তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের অস্থিরতার সময় লুট হওয়া পুলিশের ১,৩০০ অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মিডিয়া সেন্টারে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান। আইজিপি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশের পক্ষ থেকে বডি-অর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা পুলিশ সুপাররা ড্রোন ক্যামেরার সহায়তা নেবেন।

তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরাপদ নির্বাচন হিসেবে আয়োজন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং প্রায় ১ লাখ সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে আইজিপি বলেন, আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৩১৭টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন ৬০৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ৫ জন। বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংগঠন-আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫৮ জন নিহত এবং ৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসময়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মকা-ে জড়িয়েছে। পুলিশের আইজিপি বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, তার বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি এখনো রয়েছে। তিনি বলেন, মানুষ কেন পুলিশকে বিশ্বাস করে না, তা বোঝা যায়। গত ১৫ বছরে আমরা যা করেছি-আসলে গত দেড়শ বছর ধরেই আমাদের পূর্বসূরিরা মূলত মানুষকে পিটিয়েছে। ভোট তো দিতেই চাই। কিন্তু শেষপর্যন্ত কেন্দ্রে যাওয়া হবে কি-না, সেটা নির্ভর করছে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর, একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে এ কথা জানান বিলকিস আক্তার।

পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেছেন, এবারের নির্বাচনে সারাদেশে এক লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে। তাদের সাথে সাপোর্টিং হিসেবে আরো ৩০ হাজার পুলিশ বাহিনীর সদস্য। সব মিলিয়ে ভোটে পুলিশ বাহিনীর ৮৮ শতাংশ সদস্যই নির্বাচনে মাঠে দায়িত্ব পালন করবে বলে জানান মি. হোসেন। যে সব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্রতে অস্ত্রসহ দুইজন পুলিশ, আনসার ভিডিপি, গ্রাম পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে ইলিকশন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি সত্ত্বেও দেশে অপরাধীদের তৎপরতা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার চলছে। এমনকি এখন পর্যন্ত বৈধ অস্ত্র জমা পড়েনি প্রায় ২০ হাজারের বেশি, যা নির্বাচনে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ব্যভহারের আশঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সারা দেশে লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হলেও ২০ হাজারের বেশি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বারবার কড়াকড়ি আরোপ করা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট থানায় জমা না হওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা দেননি, তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মোট ৪৮ হাজার ২৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৯৯৫টি অস্ত্র সরকারি কোষাগার বা সংশ্লিষ্ট থানায় জমা পড়েছে। অর্থাৎ, এখনো ২০ হাজার ২৮৮টি লাইসেন্স করা অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে রয়ে গেছে।