আগামী ৩ মে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হচ্ছে । এবারের সম্মেলনে উঠছে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ৪৯৮ প্রস্তাব। তবে জেলা প্রশাসকরা প্রস্তাব দিয়েছেন ১৭২৯টি। সেখান থেকে বাছাই করা হয় ৪৯৮টি প্রস্তাব। আগামী ৬ মে শেষ হবে সম্মেলন। এছাড়া এবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, তিন বাহিনীর প্রধান ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকরা সাক্ষাৎ করবেন ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করা বিএনপির এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন। প্রথম দিন সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। এরপর দুপুর ১২টায় হবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনা। সমাপনী অধিবেশনও ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনেই হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জানা যায়, এবারের ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে আটজন বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলার ডিসিদের কাছ থেকে এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পেয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর মধ্যে কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ৪৯৮টি প্রস্তাবের ওপর সম্মেলনে আলোচনা হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দ্বিমত করায় এবং আগের ডিসি সম্মেলনে উপস্থাপিত হওয়ায় অনেক প্রস্তাব কার্যপত্রে রাখা হয়নি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অধিশাখা) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বলেন, ‘এ বছর ৫৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কার্যালয় ও সংস্থার বিষয়াদি ৩৪টি কার্য-অধিবেশনে আলোচনা হবে। এবার বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে মোট এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে জানিয়ে বলেন, ‘এর মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ৪৯৮টি প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ প্রস্তাবগুলো নিয়েই সম্মেলনে আলোচনা করা হবে।
সূত্র জানা যায়, সরকারের নীতিনির্ধারক, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের মধ্যে সামনাসামনি মতবিনিময় এবং প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সাধারণত প্রতি বছর ডিসি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। কার্য-অধিবেশনগুলোতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টা, সিনিয়র সচিব ও সচিবরা উপস্থিত থাকবেন। অধিবেশনের সময় ৪৯৮টি ছাড়াও ডিসিরা তাৎক্ষণিক বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরবেন। কার্যঅধিবেশনগুলোতে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের প্রস্তাবে জনদুর্ভোগ কমানো, ভূমি ব্যবস্থাপনা, জনসেবা ও স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, দেশব্যাপী পর্যটনশিল্পের বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ গুরুত্ব পাবে।
স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন, গুজব প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ও উঠে এসেছে প্রস্তাবে। এছাড়া মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা ও এগুলোর কার্যক্রম জোরদারের বিষয়েও ডিসিরা বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ডিসিরা প্রস্তাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার কারণে মাদকমুক্ত সমাজ নিশ্চিত করতে না পারা, সীমান্ত দিয়ে অবাধে মাদক আসা প্রতিরোধ, ভারতের ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহতা থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রক্ষা করতে দ্রুত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের কথা জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জি-কে প্রজেক্ট) জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (দ্বিতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নেরও প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসিরা। ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা যেন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেন সেজন্য আইন পরিবর্তন করা, কওমি মাদরাসা স্থাপনে নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট ভাষায় শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাবও দিয়েছেন ডিসিরা। এছাড়া ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় করাসহ শিক্ষা বিষয়ে আরও বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা।
দরিদ্র পরিবারের সব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা অবৈতনিক করার প্রস্তাবসহ শিক্ষা খাত বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন ডিসিরা। সব শিশুর শিখন নিশ্চিত করতে একীভূত শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়নব্যবস্থা চালুরও প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা যেন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেন সে জন্য আইন পরিবর্তন করা, কওমি মাদ্রাসা স্থাপনে নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব-পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ভাষায় শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাবও দিয়েছেন ডিসিরা। ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), গারো ও ওঁরাও (সাদরি) এই পাঁচটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশু মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে নিজস্ব ভাষার দক্ষ শিক্ষকের অভাবে কার্যকর পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় করাসহ শিক্ষা বিষয়ে আরও বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন জেলা প্রশাসকেরা।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী এমপি বলেন, ডিসিগণ সরকারের নীতি ও কর্মকৌশল দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম। আমাদের সরকারের আমলে এটিই প্রথম সম্মেলন। কাজেই আমরা এ সম্মেলনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। আমরা চাই মাঠ প্রশাসন সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুক। মাঠ প্রশাসন শক্তিশালী হলে জনগণ সুফল পাবে। আমরা নির্বাচনের সময়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ও ইশতেহারে যা ঘোষণা করা হয়েছে তার সফল বাস্তবায়ন চাই। এটি বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত তৃণমূলের কর্মকর্তাদের। এ জন্য আমরা পদন্নোতি, পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীও একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন চান। বলেন, আমরা জনগণের কাছে ইশতেহার দিয়েছি। আমাদের তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা এখন দেশের শাসক নই, আমরা হচ্ছি সেবক। আমরা দেশবাসীর সেবার জন্য দায়িত্ব নিয়েছি। এটি অক্ষরে অক্ষরে আমরা পালন করতে চাই। এ জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা আমাদের একান্ত প্রয়োজন।