মিয়া হোসেন : আজ বাংলাদেশে জিলহজ্ব মাসের ৭ম দিবস। তবে সৌদি আরবে জিলহজ্ব¡ মাসের ৮ম দিন। আজ পবিত্র হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু। লাখো কণ্ঠে ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে মক্কা। বিশ্বের প্রায় ১৭ লাখ হজ¦যাত্রী স্বাস্থ্যবিধি মেনে পবিত্র হজ্ব পালন করছেন। মহান আল্লাহ তায়ালার একত্ব ও মহত্বের কথা বিঘোষিত হচ্ছে সারাক্ষণ, সারা বেলা। আল্লাহ তায়ালা এবং বান্দার মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের অনন্য আবহে বিরাজ করছে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অসাধারণ দৃশ্য। আজ হাজীগণ ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ৪/৫ দিনের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিয়ে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনা অভিমুখে রওনা হবেন। অনেকে গতকালই মিনায় পৌছেছেন। মিনায় ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করে আরাফার অভিমুখে রওয়ানা হবে। কাল ফজরের নামাযের পর আরাফাত ময়দানে গিয়ে অবস্থান করতে হবে। এ জন্য অনেকে আজ রাতেই আরাফায় চলে যাবে।

আজ ৮ জিলহজ্ব¡ হাজীরা ইহরাম বাঁধা অবস্থায় মীনায় গিয়ে অবস্থান করবেন এবং সেখানে যোহর, আছর, মাগরিব ও এশা’র নামায আদায় করবেন। রাতে মিনায় অবস্থান করা এবং ৯ জিলহজ্ব¡ ফজরের নামায মিনায় আদায় করা সুন্নত। ৯ জিলহজ্ব আরাফার ময়দানে অবস্থান করা ফরয। আরাফার ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকতে হবে। সূর্যাস্তের পর মুযদালিফার উদ্দেশে আরাফার ময়দান ত্যাগ করবেন এবং মুযদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশা’র নামায এশা’র ওয়াক্তে একত্রে পড়বেন এবং সারারাত অবস্থান করবেন। মিনায় জামরাতে নিক্ষেপ করার জন্য ৭০টি কংকর এখান থেকে সংগ্রহ করবেন। মুযদালিফায় ফজরের নামায পড়ে মিনার উদ্দেশে রওয়ানা হবেন।

পবিত্র মক্কা থেকে প্রায় ৯ মাইল পূর্বদিকে একটি পাহাড়ের নাম ‘জাবালুর রহমত’ বা রহমতের পাহাড়। এই পাহাড় সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রলম্বিত বিরাট প্রান্তরটি আরাফাত প্রান্তর নামে পরিচিত। পাহাড়টি মধ্যম আকৃতির এবং গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত। এর উচ্চতা প্রায় ২০০ ফুট। এই পাহাড়ের পূর্বদিকে প্রস্তরের সিঁড়ি রয়েছে। এর ষষ্ঠ ধাপের উচ্চতা বরাবর আগে একটি উন্নত মঞ্চ ও একটি মিম্বর ছিল। এই মিম্বরে দাঁড়িয়ে প্রতি বছর ৯ জিলহজ্ব¡ আরাফার দিন ইমাম সাহেব খুতবা প্রদান করতেন। এখন আর সেই মঞ্চ ও মিম্বার নেই এবং এখান হতে হজ্বের খুতবাও প্রদান করা হয় না। বরং এখন খুতবা দেয়া হয় মসজিদে নামিরা হতে।

সৌদি গেজেট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার প্রেস ব্রিফিংয়ে সৌদি আরবের জননিরাপত্তা পরিচালক এবং হজ নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আল-বাসামি জানিয়েছেন, হজে¦র ধর্মীয় উদ্দেশের পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপের জন্য তারা হজ¦ মৌসুমকে অপব্যবহার করতে দেবে না। ভুয়া হজ¦ যাত্রীদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ঘোষণার পাশাপাশি হজ¦ু মৌসুমে দায়িত্ব পালনে হজ¦ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পূর্ণ প্রস্তুতির বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।

আল-বাসামি প্রকাশ করেন যে, কর্তৃপক্ষ দেশব্যাপী ২১৭টিরও বেশি ভুয়া হজ¦ অভিযান নস্যাৎ করেছে এবং বাসস্থান, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনকারী সাত হাজার ৭৩৩ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে, যারা অবৈধভাবে মক্কায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। কর্তৃপক্ষ মক্কার প্রবেশপথগুলোতে তিন লাখ ৬৬ হাজার অননুমোদিত ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের পরিবহনে ব্যবহৃত হাজার হাজার অননুমোদিত যানবাহন আটক করেছে।

তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের সূচকগুলো গত বছরের তুলনায় নিয়ম পালনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখিয়েছে, যার মধ্যে লঙ্ঘনকারী ও নির্বাসিতের সংখ্যা ৪৪ শতাংশ, ভুয়া হজ¦ প্রচারণা ১২ শতাংশ এবং বাসস্থান ও সীমান্ত বিধি সংক্রান্ত লঙ্ঘন ৩৩ শতাংশ হ্রাসের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। দেশটির পাসপোর্ট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ড. সালেহ আল-মুরব্বা জানিয়েছেন, গত শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত বিদেশ থেকে ১৫ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি হজ¦যাত্রী পৌঁছেছেন, যার মধ্যে ১৪ লাখ ৫৭ হাজারেরও বেশি বিমানবন্দর দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন।

এদিকে আরব নিউজ সূত্রে জানা গেছে, হজ¦ মৌসুমে মক্কায় তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মদিনায় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতা এবং খোলা জায়গায় ধুলি উড়ানো বাতাসের সম্ভাবনাও রয়েছে। এ সময় পানিশূন্যতা এড়াতে হজ¦যাত্রী ও ভ্রমণকারীদের প্রচুর পরিমাণে তরল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে পবিত্র হজের খুতবা চলতি বছরও বাংলাসহ বিশ্বের ৫০টি ভাষায় অনুবাদ ও সম্প্রচার করা হবে। এর মাধ্যমে টানা সপ্তমবারের মতো বাংলা ভাষায় হজে¦র খুতবা শুনতে পারবেন বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা। সৌদি আরবের পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর তত্ত্বাবধানকারী জেনারেল প্রেসিডেন্সির অধীনে পরিচালিত এ কার্যক্রমে এবার বাংলা অনুবাদ দলের দায়িত্ব পালন করবেন চার বাংলাদেশি। তারা হলেন ড. মুহাম্মদ খলীলুর রহমান, ড. আ ফ ম ওয়াহিদুর রহমান, মুবিনুর রহমান ফারুক এবং নাজমুস সাকিব।

জানা গেছে, অনুবাদ কার্যক্রমে যুক্ত চারজনই মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। বাংলা বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. মুহাম্মদ খলীলুর রহমান। তিনি জানান, আরাফাতের ময়দান থেকে প্রচারিত হজে¦র খুতবা বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করা হবে। অনুবাদ কার্যক্রমে পুরো দল অংশ নিলেও উপস্থাপনায় সাধারণত দুজন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এর আগে একাধিকবার হজে¦র খুতবার বাংলা অনুবাদ উপস্থাপনা করেছেন।