বরিশালে আদালতের এজলাসে ঢুকে হট্টগোল, ধাক্কাধাক্কি, ভাঙচুর ও বিচারককে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় জেলা আইনজীবী নেতা সাদিকুর রহমান লিংকনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

গতকাল বুধবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ রুল জারি করেন।

রুলে আদালত অবমাননার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১০ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ১১ মার্চ দিন ঠিক করেছেন আদালত।

সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শফিকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতাদের একের পর এক জামিন দেওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার দুপুরে চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জন করেন জেলা আইনজীবী সমিতি। এরপর বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।

তবে আদালত বর্জনের ঘোষণার মধ্যেই এজলাসের কার্যক্রম শুরু করতে চাইলে আইনজীবীরা তা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান।

বিকেল পৌনে ৩টার দিকে বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাসে ঢুকে হট্টগোল করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনসহ কয়েকজন আইনজীবী। তারা এজলাসে ঢুকে বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি ও চিৎকার করার পাশাপাশি নথিপত্র তছনছ করেন। পরে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ওই ভিডিওতে দেখা যায়, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ একটি মামলার শুনানি করছেন। আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) ও আদালত পুলিশের তিন কনস্টেবল উপস্থিত আছেন। শুনানি করছিলেন দুই আইনজীবী। এর মধ্যে দরজা খুলে চিৎকার করতে করতে এজলাস কক্ষে ঢোকেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান। তার পেছনে আরও কয়েকজন আইনজীবী এজলাসে প্রবেশ করেন।

এসময় সাদিকুর রহমান লিংকন বিচারকের সামনে গিয়ে চিৎকার করে আঙুল তুলে কথা বলেন। তিনি বিচারকের সামনে থাকা একটি বেঞ্চে আঘাত করেন এবং বিচারকের উদ্দেশে কিছু বলতে থাকেন। পরে তারা এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন।

এ ঘটনায় গতকাল বুধবার দুপুরে আদালত চত্বর থেকে আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনার পর আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।

পরে লিংকনকে অতিরিক্ত চিফ ম্যাট্রোপলিটন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক এসএম শরীয়াতুল্লাহ তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গত সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম শরীয়তউল্লাহ তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের তিন নেতাকে জামিনে মুক্তি দেন আদালত। জামিন পাওয়া অন্য দুজন হলেন- বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন এবং বরিশাল মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান।

এ নিয়ে জেলা আইনজীবী সমিতি তথা বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা অসন্তোষ জানিয়ে আসছিলেন।

আমাদের বরিশাল অফিস জানান : বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে আইনজীবী ও বিচারকদের পাল্টাপাল্টি বর্জনে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পুরো আদলাত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই মধ্যে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার সময় তাকে আদালত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতির বিরুদ্ধে আদালতের এজলাসে ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়েছে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়েছে। এদিকে আদালত কক্ষে ভাঙচুরের প্রতিবাদে বিচারকরা বিচার কাজ বন্ধ রেখেছেন। পুরো আদালত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আদালত চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন আইনজীবীরা।’

বরিশাল জজ কোর্টের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, ‘সকালে আদালতের কার্যক্রম শুরুর পরপরই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী আদালতে প্রবেশ করে। এ সময় বিচারক আদালত বর্জন করেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী আইনজীবী সমিতির কার্যালয় অভিযান চালিয়ে সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে আটক করে। আমরা এর প্রতিবাদে মিছিল করেছি এবং আদালত বর্জন করেছি।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি তালুকদার মো. ইউনুসকে জামিন দেয়ার প্রতিবাদে বরিশালের আইনজীবীরা মঙ্গলবার মহানগর আদালত বর্জন করেছেন। তারা সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের অপসারণ ও তালুকদার ইউনুসের জামিন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তালুকদার ইউনুস গত সোমবার বরিশাল অতিরিক্ত মহানগর ম্যজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান।

জানা গেছে, তার জামিনের পর পরই বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ক্ষুদ্ধ হন। বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির আহ্বানে মঙ্গলবার তারা মহানগর সংশ্লিষ্ট সকল আদালত বর্জন করেন। তবে ওই দিন রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঢুকে হট্টগোল করে বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেন।