২০২৬-২৭ অর্থনীতির চলমান সংকটের মধ্যেও আসছে অর্থবছরের বাজেটে সরকার উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখছে ৩ লাখ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটের তুলনায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি। যা বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাসে উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অর্থনীতিবিদরা, নতুন সরকারের এই বরাদ্দকে উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবায়ন অযোগ্য বলে মনে করেন। তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও রাজস্ব ঘাটতির চাপের মধ্যে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এই অবস্থায় উন্নয়ন বাজেট আরও বাস্তব ভিত্তিক হওয়া দরকার।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আজকের পত্রিকা বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়নে সংযম ও বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা জরুরি। অতিরঞ্জিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে এবং নীতিনির্ধারণে বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছর। এই বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার প্রস্তাব করা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। সংশোধিতএডিপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
সূত্র মতে, ৩ লাখ কোটি টাকার মধ্যে আসছে বাজেটের এডিপিতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা জোগানের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এবছরের বাজেটে এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগÑপ্রায় ৩৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এর পরেই রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রায় ৩২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে প্রায় ২০ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগে ১৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ১৭ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পেতে পারে ১৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ১৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ১১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৯ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা এবং কৃষি মন্ত্রণালয় প্রায় ৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে পারে।
পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের তথ্য মতে, এর আগের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বরাদ্দ। তার আগের দুই অর্থবছরের যথাক্রমে ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ সালে ২ লাখ ৪৬ হাজার এবং ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু কোনো বছরই বরাদ্দের অর্থ ব্যবহার করতে পারেনি মন্ত্রনালয়গুলো।
শেখ হাসিনার পতনের পর ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রেখেছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কোনো বছরই উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ বাস্তবায়ন হয়নি। বরং বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র খুব একটা সন্তোষজনক নয়। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৩০ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৬৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বাস্তবায়ন হার অত্যন্ত কম। সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে বরাদ্দ থাকলেও আট মাসে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। এ ছাড়া কয়েকটি বিভাগ ১০ শতাংশ ব্যয়ও করতে পারেনি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, বাজেটের আকার নয়, গুণগত মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প গ্রহণে বাস্তবতা ও সক্ষমতার সমন্বয় জরুরি, না হলে অপচয় বাড়বে এবং প্রত্যাশিত ফল মিলবে না।
নাম না প্রকাশের শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এডিপির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প বাছাই, সম্ভাব্যতা যাচাই, মনিটরিং জোরদার ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ও বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে বড় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকছেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা কাক্সিক্ষত ফল নাও দিতে পারে।