রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল সংগ্রহে ভোগান্তি আগের চেয়ে অনেকেটাই কমেছে। এখনো তেলের জন্য ক্রেতাদের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। গাড়ি চালক ও ফিলিং স্টেশনের মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুয়েল পাসের মাধ্যমে তেল বিক্রি করায় শৃঙ্খলা ফিরেছে। একজন ক্রেতা এক সঙ্গে ১ হাজারের বেশি টাকার তেল কিনতে পারায় ভোগান্তিও কমেছে বলে জানান তারা।

এক সপ্তাহ আগেও রাজধানী ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল সংগ্রহে ভয়াবহ ভোগান্তি পোহাতে হতো। রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে অপেক্ষা, আর কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি- সব মিলিয়ে নগরজীবনে নেমে এসেছিল চরম বিপর্যয়। গত কয়েকদিনে লাইন ছোট হতে হতে এখন প্রায় স্বস্তিতেই সংগ্রহ করা যাচ্ছে জ্বালানি। গতকাল সোমবার সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোথাও দীর্ঘ লাইন নেই। স্বাভাবিক গতিতেই গ্রাহকরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন চলাচলের প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় তেলের লাইনের কারণে তৈরি হতো দীর্ঘ যানজট। সন্ধ্যায় ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, বাসের লাইন বাড়লে যানজট আরও ভয়াবহ রূপ পেতো। সে অবস্থারও অনেকটা পরিবর্তন এসেছে।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শাহবাগ, নীলক্ষেত ও রমনা এলাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এক সপ্তাহ আগেও যে লাইন প্রধান সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সেখানে এখন স্টেশনের ভেতরেই সীমিত সংখ্যক যানবাহনের স্বাভাবিক সারি দেখা যায়। তেল নেওয়ায় কোনো তাড়াহুড়া কিংবা বাগবিত-া নেই। সবাই ধীরস্থিরভাবেই তেল নিচ্ছেন। নীলক্ষেত ফিলিং স্টেশনে একসময় লাইন নীলক্ষেত থেকে আজিমপুর, পলাশী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছে যেত। সেখানে স্টেশনের চৌহদ্দির বাইরেও খুবই স্বল্পসংখ্যক যানবাহন অপেক্ষমাণ দেখা গেছে। লালবাগের বাসিন্দা সাব্বির হোসেন বলেন, এক সপ্তাহ আগে ৭-৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৫শ টাকার তেল পেয়েছিলাম। আজ মাত্র ৫ মিনিটেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিতে পেরেছি।

যে কারণে শৃঙ্খলা: সংকট ঘণীভূত হতে থাকা জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত ৯ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করে সরকার। প্রথমে ঢাকা এবং পরে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও চালু হচ্ছে এ পাস। প্রথমে মোটরসাইকেলের জন্য এ পাস চালু করলেও ২৬ এপ্রিল থেকে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ফুয়েল পাস দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ওয়েবসাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে এ সেবা নেওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকার ১১টি পাম্প থেকে শুধু ফুয়েল পাসের মাধ্যমে তেল বিতরণ হচ্ছে। কয়েকদিন আগে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল (অকটেন) নিতে মহাখালী রেলক্রসিং পর্যন্ত দীর্ঘ যানবাহনের লাইন লেগে থাকতো। ফিলিং স্টেশনের মালিক গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জানান, ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ওই মুহূর্তে মাত্র ছয়টি মোটর সাইকেল রয়েছে। শাহবাগ মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে দেখা যায় তুলনামূলক কম ভিড়। এখানে মোটরসাইকেল চালকদের ফুয়েল পাসে তেল দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ চৌধুরী বলেন, ফুয়েল পাস ব্যবস্থা একটি ভালো উদ্যোগ। এতে কারা কতটুকু জ্বালানি নিচ্ছে তার রেকর্ড থাকছে। ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের প্রবণতা কমে গেছে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও উৎপাদন খরচের তুলনায় ভর্তুকির বোঝা কমাতে সরকার গত ১৯ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। নতুন দাম অনুযায়ী ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা (১৫ টাকা বৃদ্ধি), কেরোসিন ১৩০ টাকা (১৮ টাকা বৃদ্ধি), অকটেন ১৪০ টাকা (২০ টাকা বৃদ্ধি) এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা (১৯ টাকা বৃদ্ধি) নির্ধারণ করা হয়। দাম বাড়ানোর পর সরকার তেলের সরবরাহও ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সরবরাহ বাড়ানো ও ফুয়েল পাস চালুর প্রভাবে ধীরে ধীরে শুরু হয় লাইন কমার প্রবণতা। মৎস্য ভবন সংলগ্ন রমনা ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় একই চিত্র। কয়েকদিন আগেও প্রেস ক্লাব, সেগুনবাগিচা ও বারডেম হাসপাতাল এলাকা পর্যন্ত দীর্ঘ যানবাহনের সারি থাকতো। গত সোমবার পুরো এলাকা ছিল প্রায় যানজটমুক্ত। স্টেশনের কর্মীরা জানান, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা ও আতঙ্ক কমে যাওয়ায় এখন গ্রাহকরা প্রয়োজন অনুযায়ী আসছেন। ফলে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হচ্ছে না।

গতকাল সোমবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় বলা হয়, সারাদেশে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও সুশৃঙ্খল করতে সরকার কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস বিডি’ সিস্টেম চালু করেছে। এখন থেকে দেশের সব ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল পাস ব্যবহার বাধ্যতামূলক। জ্বালানি বিতরণ প্রক্রিয়া তদারকি করতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফিলিং স্টেশনের জন্য জরুরি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল প্রদানকারী দেশের সব ফিলিং স্টেশনকে বাধ্যতামূলকভাবে এই সিস্টেমের আওতায় নিবন্ধন করতে হবে।

১১ পাম্পে ফুয়েল পাস কার্যকর: রাজধানীর ১১টি ফিলিং স্টেশনে আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) থেকে মোটরসাইকেলে জ্বালানি দেওয়ার জন্য ফুয়েল পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজের এক পোস্টে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলো হচ্ছে করিম অ্যান্ড সন্স, শাপলা চত্বর, ঢাকা; ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ (ফিলিং স্টেশন), মহাখালী, ঢাকা; মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশন, এয়ারপোর্ট, উত্তরা, ঢাকা; মেসার্স সততা অ্যান্ড কোম্পানি, ৪৩৯, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা; মেসার্স দিগন্ত ফিলিং স্টেশন, সেকশন-১৪, ইব্রাহিমপুর, মিরপুর, ঢাকা; মেসার্স কামাল ট্রেডিং এজেন্সি, ৮০, শহীদ তাজউদ্দিন আহম্মেদ সরণি, তেজগাঁও, ঢাকা ; মেসার্স এসপি, ফিলিং স্টেশন লিমিটেড, গাবতলী, মিরপুর, ঢাকা; সিটি ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁও ঢাকা-মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড; সেবা গ্রীন ফিলিং স্টেশন, উত্তরা-মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড; স্যাম এসোসিয়েটস, মিরপুর-০২-মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড; সুমাত্রা ফিলিং স্টেশন-কালশী রোড, মিরপুর। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ব্যক্তিগত গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের জন্য ‘ঘ’ সিরিজ উন্মুক্ত করা হয়েছে। ঘ এর আগে গতকাল ক, খ এবং গ সিরিজের গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।