মুহাম্মদ নূরে আলম: আগামী ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ জোর কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গত তিনমাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৯ দেশের সফর করেছেন, ঐ দেশগুলোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলোতে আগত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশের জন্য ভোট চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পঞ্চায়েত বা সভা হলো জাতিসংঘ। আর সেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ‘সভাপতি’ পদকে সহজ কথায় বলা যায় বিশ্ব সংসদের স্পিকারের আসন। জাতিসংঘে বর্তমানে মোট সদস্য রাষ্ট্র বা ভোটার সংখ্যা ১৯৩টি। যদি নির্বাচনে ১৯৩টি দেশের সবাই ভোট প্রদান করে, তবে নির্বাচিত হতে হলে ন্যূনতম ৯৭টি দেশের ভোট পেতে হবে। এবারের ৮১তম অধিবেশনের এই সভাপতি পদের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ এবং ইউরোপের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস। বাংলাদেশের প্রার্থী বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের প্রার্থী সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস।

সাধারণত নিয়ম অনুযায়ী, অধিবেশন শুরু হওয়ার অন্তত তিন মাস আগেই সভাপতি নির্বাচন সম্পন্ন করে রাখা হয়, যাতে নির্বাচিত সভাপতি নতুন অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে নিজের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গুছিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পান। সেই হিসেবেই আগামী ২ জুন ভোট হচ্ছে এবং আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মূল অধিবেশন শুরু হচ্ছে। কূটনৈতিক অঙ্গনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন; কে এগিয়ে? শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জুটতে যাচ্ছে এই বিশ্বমঞ্চের শীর্ষ আসনটি? পর্দার আড়ালে এখন চলছে এক নীরব ও তীব্র ভোটযুদ্ধ। উল্লেখ্য যে, আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। চার দশক পর আবারও সেই সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সামনে।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পালাক্রমে একজন করে সভাপতি বা স্পিকার নির্বাচিত হন। ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের এই ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদটি এবার নির্ধারিত হয়েছে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ বা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য। প্রথম দিকে এই পদে ফিলিস্তিনও প্রার্থী হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ফিলিস্তিন সম্প্রতি তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় লড়াইটি এখন সরাসরি দ্বিপাক্ষিক রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের নিয়ম (জঁষব ৮৬) অনুযায়ী, “সবসনবৎং ঢ়ৎবংবহঃ ধহফ াড়ঃরহম” অর্থাৎ “যেসব দেশ উপস্থিত থেকে সরাসরি পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেবে”-শুধু তাদের ভোটই গণনা করা হয়। কোনো দেশ যদি ভোটদানে বিরত থাকে বা অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই ভোটগুলো মোট হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়। যেমন, গত বছরের নির্বাচনে মোট ১৯৩টি দেশের মধ্যে বেশ কিছু দেশ ভোটদানে বিরত থাকায় মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা কমে এসেছিল এবং জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাটি ৮৮-তে নেমেছিল।

কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ বলছে, বাংলাদেশের পাল্লা বেশ ভারী: বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসি ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, ওআইসিভুক্ত দেশগুলো শুধু ভোটই দেবে না, বরং ঢাকার পক্ষে বিশ্বজুড়ে প্রচারণাও চালাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার বৃহৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর একটি বড় অংশের ভোট বাংলাদেশের ঝুলিতে আসার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের শান্তিমিশন ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভাবমূর্তির কারণে আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশের ভোট পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ঢাকা। অন্যদিকে, সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় পশ্চিমা দুনিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলোর ভোট টানার চেষ্টা করছে।

নির্বাচন নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অত্যন্ত সক্রিয় ও আশাবাদী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান একাধিকবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমাদের পুরো কূটনৈতিক দল বিশ্বজুড়ে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। ফিলিস্তিন সরে যাওয়ার পর ওআইসি দেশগুলোর পূর্ণ সমর্থন আমাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরও সাংবাদিকদের জানান, ওআইসি এবং এশিয়ার দেশগুলোর কাছ থেকে আমরা যে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি, তা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। বাংলাদেশ বৈশ্বিক শান্তি ও কূটনীতিতে সব সময় দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে। আমাদের প্রার্থীর যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার কারণে ২ জুনের নির্বাচনে আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নিউইয়র্কে আমাদের মিশনসহ বিশ্বজুড়ে সব দূতাবাস দিনরাত কাজ করছে। জাতিসংঘের বিধি অনুযায়ী মে মাসেই প্রার্থীদের সঙ্গে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতবিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। আমরা প্রতিটি ভোট নিশ্চিত করার জন্য আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলোকে কাজে লাগাচ্ছি।

বৈশ্বিক কূটনৈতিক তৎপরতা: বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বৈশ্বিক কূটনীতি ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. খলিলুর রহমান বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। সরকারি নথিপত্র এবং কূটনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি ৯টি দেশ সফর করেছেন এবং অসংখ্য দেশের সাথে বৈঠক করেছেন। দেশগুলো হলো: ১. দায়িত্ব নেওয়ার পর সৌদি আরব ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর (জেদ্দায় ওআইসির জরুরি বৈঠক)। ২. যুক্তরাজ্য (লন্ডন) ৩. জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন সফর করেন। ৪. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে তিনি ভারতের নতুন দিল্লীতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। ৫. ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি মরিশাসে সফর করেন। ৬. তুরস্কের আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে অংশ নেন। ৭. বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) সই করতে যান। ৮. ব্রাসেলস থেকে ফেরার পথে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় দ্বিপাক্ষিক উদ্দেশ্যে যাত্রাবিরতি ও সফর করেন। ৯. দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের উদ্দেশ্যে তিনি চীনের বেইজিং সফর করেন। এছাড়াও ওআইসি এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

বেশিরভাগ সফরেই তার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে বৈশ্বিক সমর্থন এককাট্টা করতেই মূলত এই গতিশীল কূটনৈতিক সফরগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের এই নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি কোনো নির্দিষ্ট ৫টি বা ১০টি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেহেতু এটি বিশ্বমঞ্চের একটি নির্বাচন, তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক দল পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের প্রায় সবগুলোর কাছেই ভোট ও সমর্থন চেয়েছেন।