গুমের শিকার সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান তার জবানবন্দীতে আয়নাঘরের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, কক্ষটি ৮ থেকে ১০ ফুটের ছিল। মেঝে ছিল স্যাঁতসেঁতে। হাইভোল্টেজের বাতি জ্বালানো থাকতো সারাক্ষণ। কক্ষটি দেখতে নোংরা, ভয়াবহ ও বীভৎস ছিল। রক্ত দিয়ে দেয়ালে লেখা ছিল মোবাইল নম্বর। একটি চৌকি থাকলেও বিছানার চাদর ছিল রক্তমাখা।
গতকাল রোববার জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যে তিনি একথা বলেন।
এদিন দ্বিতীয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে হাসিনুর রহমানের জবানবন্দী রেকর্ড করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। বাকি সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জবানবন্দীর শুরুতে প্রথম দফায় গুমের বর্ণনা দেন হাসিনুর রহমান। ২০১১ সালের ৯ জুলাই ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত থাকতে তাকে গুম করা হয়। ৪৩ দিন গুম থাকার পর সেনা আদালতে চার বছরের সাজা দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ছিল বলে জানান এই সেনা কর্মকর্তা। দ্বিতীয় দফায় গুম হন ২০১৮ সালে। মুক্তি পেয়েছেন ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি।
হাসিনুর রহমান বলেন, দ্বিতীয় দফায় গুমের দিন তথা ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় মিরপুর ডিওএইচএস-এ আমার বাসায় আসেন বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আবদুল্লাহ। বাইরে ঘুরতে বের হওয়ার জন্য অনেক জোরাজোরি করেন তিনি। চাপাচাপির পর আমরা ঘুরতে বের হই। দুই ঘণ্টা ঘোরাঘুরি শেষে একই এলাকায় মেজর মহসিনের বাসায় যাই। সেখান থেকে রাত ১০টায় বের হই। আমার পেছনে ছিলেন যায়িদ। পকেট গেটের দিকে আসতেই ৮-১০ জন লোকের উপস্থিতি লক্ষ্য করি। রাতে এতো লোকের উপস্থিতি অস্বাভাবিক ছিল। একপর্যায়ে তারা আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন পেছনে ফিরতেই দেখি আমার বন্ধু যায়িদ নেই।
তিনি বলেন, সামনেই আমার শ্যালিকার বাসা ছিল। তখন ওই বাসার কেয়ারটেকার সেকান্দারকে ডেকে আনি। আর আমার লাইসেন্স করা অস্ত্র দেখিয়ে ওই লোকদের হাত উঁচু করতে বলি। তাদের একসঙ্গে জড়ো হতে বলে সামনে থাকা একটি মাইক্রোবাসের দিকে নেওয়ার চেষ্ট করি। ওই সময় আরও চারটি মাইক্রো ঢোকে। এ সময় একা সামলাতে না পেরে দ্বিতীয় কেয়ারটেকার মুক্তারকে ডাকা হয়। একপর্যায়ে তাকে মাইক্রোর ছবি তুলতে বলি। ছবি তুলতে গেলে মুক্তারকে শকবাটনে আঘাত করে মাইক্রোবাসের ভেতরে নিয়ে যান তারা। ওই সময় পেছনে থাকা গাড়ির লোকজন এসে আমার কোমরে আঘাত করেন। একইসঙ্গে পাঁচ-সাতজন ঝাপটে ধরেন। তখন তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে আরেকটি মাইক্রোবাস এসে আমাকে জোর করে তুলে ফেলে।
হাসিনুর বলেন, মাইক্রোতে তুলে আমাকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখে জমটুপি পরানো হয়। এরপর কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে গাড়ি চালানো শুরু করেন। ২০-২৫ মিনিট পর গাড়িটি থামে। এরপর গেট খোলার শব্দ শোনা যায়। তখন আমাকে ইচ্ছেমতো মারধর করে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তর করে তারা। এতে আমি নিস্তেজ হয়ে যাই। তারা আমাকে ধরাধরি করে একটি কক্ষে নিয়ে যায়। এরপর হাতকড়াসহ চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। ওই সময় সেখানে চার-পাঁচজন লোক দেখি। তারা আমাকে রেখে দরজা বন্ধ করে চলে যায়।
কক্ষের বিবরণে তিনি বলেন, কক্ষটি ৮/১০ ফুটের ছিল। মেঝে ছিল স্যাঁতসেঁতে। হাইভোল্টেজের বাতি জ্বালানো থাকতো সারাক্ষণ। কক্ষটি দেখতে নোংরা, ভয়াবহ ও বীভৎস ছিল। রক্ত দিয়ে দেয়ালে লেখা ছিল মোবাইল নম্বর। একটি চৌকি থাকলেও বিছানার চাদর ছিল রক্তমাখা। এছাড়া প্রচ- গরমে আমি অস্থির হয়ে যাই। আধাঘণ্টা পর হাতকড়া পরিয়ে আগের মতো চোখ বেঁধে চড়-থাপ্পড় আর কিল-ঘুষি মারতে মারতে আরেকটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। কক্ষটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল। সেখানে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে আমাকে একজন জিজ্ঞাসা শুরু করেন। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল তিনি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা। প্রথমত তিনি আমার ফেসবুক আইডি জানতে চান। মনে নেই বললে তিনি ক্ষেপে যান।
ওই সময় আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় কেন আমি সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি। এজন্য আমাকে মেরে ফেলাসহ লাশ গুমের হুমকি দেন ওই কর্মকর্তা। একপর্যায়ে আমি কোথায় আছি জানতে চাওয়া হয়। জবাবে বলি ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরে আছি। তখন বলা হয়, কীভাবে বুঝতে পেরেছেন। এ সময় পাশ থেকে একজন বলছিলেন আপনি আয়নাঘরে আছেন। একটু পর আমাকে ইলেকট্রিক শকসহ মারধর শুরু করা হয়। সম্ভবত জিজ্ঞাসা করা লোক তখন ছিলেন না। এরপর আবার মারধর করতে করতে আগের কক্ষে নিয়ে আসা হয়। পরদিন একইভাবে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
হাসিনুর বলেন, দ্বিতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদে বলা হয়Ñ ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে কেন কথা বলি? আওয়ামী লীগ ও ভারত সম্পর্কে কেন নেতিবাচক লেখালেখি করি। আমি জিজ্ঞেস করি কী কারণে আমাকে তুলে আনা হয়েছিল? তিনি বলেন- কী কারণে আনা হয়েছে জানি না। তবে সরকারের নির্দেশে আনা হয়েছে। আপনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। অধস্তনদের নির্দেশ মানবেন।
একপর্যায়ে আমাকে বলা হয়, আপনার গ্রেপ্তারের জন্য কাকে-কাকে সন্দেহ করেন। জবাবে আমি বললাম, আমার বন্ধু যায়িদ, ব্রিগেডিয়ার আজহারসহ ডিজিএফআই ও র্যাব জড়িত। ব্রিগেডিয়ার আজহার তখন ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদীসহ অন্যরা।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামী করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। এদিন সকালে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনে পুলিশ।
পলাতক ১০ আসামীর পাঁচজনই বিভিন্ন মেয়াদে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
বাকিরা হলেন- শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।