নাসিমা বেগম জানতেন না, ১২ বছর আগে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা জীবনটা এভাবে থমকে যাবে পদ্মার ঢেউয়ে। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর টানা ৭২ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থেকেও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি।

সেই আলোচিত নাসিমা এবার হার মানলেন ভাগ্য আর প্রকৃতির কাছে। গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবিতে সলিল সমাধি হয়েছে এই জীবনসংগ্রামী নারীর।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মধ্য আটরাই গ্রামের বাসিন্দা নাসিমা বেগম (৪০) ছিলেন জীবনযুদ্ধের এক নির্ভীক সৈনিক। স্বামী নূর ইসলামের মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সাভারে ভাগনি আজমিরার বাড়িতে যান চাকরির খোঁজে।

কিন্তু মাসজুড়ে চেষ্টা করেও জোটেনি কাজ। ভাগ্য বদলাতে ফরিদপুরে ভাগনির শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েই ঘটে বিপত্তি।

গত ২৫ মার্চ (বুধবার) বিকেলে নাসিমা, তার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন, ভাগনি জামাই আব্দুল আজিজ ও চার বছরের শিশু আব্দুর রহমানকে নিয়ে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই তলিয়ে যান সবাই।

প্রায় ছয় ঘণ্টা উদ্ধার অভিযানের পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে উদ্ধার হয় নাসিমার নিথর দেহ। একই সঙ্গে প্রাণ হারান তার ভাগনি ও চার বছরের নাতি।

স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও বিপত্তি যেন পিছু ছাড়ছিল না। অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে গ্রামে ফেরার পথে কুষ্টিয়া এলাকায় গাড়িটি আবারও দুর্ঘটনার শিকার হয়।

তবে এবার বড় কোনো ক্ষতি না হওয়ায় গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। নাসিমার এমন করুণ মৃত্যুতে পার্বতীপুরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

খবর পেয়ে নিহতের বাড়িতে গিয়ে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল ওয়াদুদ।

এদিকে পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদ্দাম হোসেন জানান, জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

রানা প্লাজার সেই ধসে পড়া কংক্রিটের নিচ থেকে বেঁচে ফেরা নাসিমা আজ চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন মাটির নিচে। রয়ে গেছে শুধু তার অদম্য সাহসের গল্প আর ভাগ্যের এক নিষ্ঠুর পরিহাসের স্মৃতি।