সরকার গঠনের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বুধবার সকালে গুলশানের বাসা থেকে নিজের সাদা টয়োটা গাড়িতে চড়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এই সময়ে তার গাড়িবহরের সংখ্যা কম ছিলো। সাভার থেকে প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অপর্ণ করেন। দুই জায়গাই প্রধানমন্ত্রীর সাথে পুরো মন্ত্রিসভার সদস্যরা ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী আসেন সচিবালয়ে।
বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটে সরকারপ্রধান ওই ভবনে নিজের দফতরে পৌঁছান। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সচিবদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। নিজ নিজ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তিনটার আগমুহূর্তেই তারা সচিবালয়ের এক নম্বর ভবনে পৌঁছান।
এদিকে নতুন সরকারের প্রথম কার্যদিবসে সচিবালয় এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও তৎপরতা লক্ষ্য করে গেছে।
বৈঠকে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অগ্রাধিকার তিনটি হলো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথমাফিক সরকারের প্রথম দিনে একটি মন্ত্রিসভার বৈঠক করতে হয়। বৈঠকে মন্ত্রিসভার সব সদস্য বসেছিলেন। বৈঠকে উপদেষ্টারাও ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের কিছু অনুশাসন দিয়েছেন। সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে। সেটি পরে জানানো হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে (গ্যাস-বিদ্যুৎ) যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা রয়েছে। এগুলো হলো অগ্রাধিকার।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হচ্ছে পবিত্র রমযান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মানুষের জন্য সহনীয় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, বিশেষ করে তারাবিহ ও ইফতারের সময়। মূলত এই তিন বিষয় অগ্রাধিকারে এসেছে। এগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কর্মপরিকল্পনা দু-এক দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। সচিবের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রধানমন্ত্রী সচিবদের বলেছেন জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। সুতরাং সংবিধান ও আইনবিধি অনুযায়ী ওই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচিবরা আন্তরিক হবেন, সেই আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সবাইকে আমরা বলেছি, কে, কার কী অ্যাফিলিয়েশন (সম্পৃক্ততা) আছে, সেটি আমরা দেখব না। আমরা মেধার ভিত্তিতে সবাইকে যাচাই করব।
এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, জনগণ রায় দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইশতেহার দেখে। নিশ্চয় তারা ইশতেহারকে পছন্দ করেন। সেই ইশতেহার যেন জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পূরণ হয়, সে জন্য সব সচিবের মেধাকে কাজে লাগিয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করা দেশের জন্য ভালো।
প্রথম কর্মদিবস শেষে সচিবালয় ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার সন্ধ্যা ৭টা ৩৬ মিনিটে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু থেকে বেরিয়ে যান তিনি। দিনভর ব্যস্ত কর্মসূচি ও একাধিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে কাটে তার প্রথম অফিস দিবস। সচিবালয়ে সাত ঘণ্টা অফিস করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন ১ নম্বর ভবনের তিনতলায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত কার্যালয়ে বসেই তিনি দিনের কার্যক্রম শুরু করেন।
তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সেহরি, ইফতার ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর এসব কথা জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের যে এত বিপুল জনসমর্থন, সেটার জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রী আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, জনগণ আমাদের কাছ থেকে যে সুশাসন এবং জবাবদিহিতা চায়, সেক্ষেত্রে আমরা স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের যারা দায়িত্বে আছি, তারা যেন যেকোনো ধরনের প্রভাব এবং স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করি এবং বিশেষ করে দুর্নীতির প্রশ্নে যেন আমাদের একটা শক্ত অবস্থান থাকে। আগামীতে যে রমযান শুরু হচ্ছে, এই রমযানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা প্লাস হচ্ছে সেহরি, ইফতার, তারাবির সময়টা যেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক থাকে এবং সরকারের যে কমিটমেন্ট, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় যে বিষয়গুলো বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড সেগুলো কীভাবে ইমিডিয়েটলি আসলে কিছু দৃশ্যমান কাজ করা যায়, সেই বিষয়গুলো নিয়েও তিনি আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন।
নুর বলেন, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘোষণা ছিল যে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে সরকারের একটি উদ্যোগ থাকবে। সেটি নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন যে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে কী করা যায়। সামগ্রিকভাবেই সমস্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে।
এদিকে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, সরকারি গাড়িতে নয় নিজস্ব গাড়িতে চড়বেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজের গাড়ি, নিজের চালক ও নিজের ক্রয়করা জ্বালানি ব্যবহার করবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন না। গতকাল বুধবার দিনের কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী সাভার ও শেরে বাংলা নগর গিয়েছিলেন নিজের টয়েটা গাড়ি চড়ে, সেখানে থেকে সচিবালয়ে এসেছেন সেই গাড়িতেই।
এদিকে যানজটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার গাড়িবহরের সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এতোদিন প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সংখ্যা ছিলো ১৩/১৪টি। সেটি কমিয়ে ৪টি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পতাকাবিহীন গাড়ি ব্যবহার করছেন। তবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান অথবা বিদেশী মেহমানদের সফর উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে পতাকা ব্যবহৃত হবে।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য রুমন বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখন থেকে মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে কথার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক হলে সকল মন্ত্রীদের সচিবালয় থেকে একটা জট সৃষ্টি হয়, ভিআইপি চলাচলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মুখে পড়ে। সেসব কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে বেশিরভাগ সময়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রী যাত্রাপথে সড়কের দুইধারে পোষাকধারী পুলিশের অবস্থানের যে বিধান তার বন্ধ করার জন্যও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান রুমন।