- রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বামীর কবরের পাশেই দাফন সম্পন্ন
- কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় চিরবিদায় দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার
‘যতক্ষণ বেঁচে থাকব, দেশবাসীকে ছেড়ে যাবো না। এ দেশ ও এদেশের জনগণই আমার সব’। বেঁচে থাকতে হাজারো হুমকি ধামকিকে উপেক্ষা করে প্রায়শ খালেদা জিয়া একথাগুলো বলতেন। দেশ ও জনগণের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসায় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠা সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সেজন্য শেষ বিদায় জানাল কোটি মানুষ। অসীম অনন্ত লোকে পাড়ি জমানোর সময় জানাযায় লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসা সঙ্গী করে নিয়ে গেলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বাঁধভাঙ্গা কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় চন্দ্রিমা উদ্যানে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই সমাহিত হলেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার দাফনের মধ্য দিয়ে এক বর্ণাঢ্য ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো।
গতকাল বুধবার বিকাল ৩টা ৩ মিনিটে ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পশ্চিম প্রান্তে খালেদা জিয়ার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাযে ইমামতি করেন বায়তুল মোকারর জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালেক। খালেদা জিয়ার জানাযাকে কেন্দ্র করে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়েছে আশপাশের এলাকায়। এ সময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আশপাশ, বিজয় সরণি, খামার বাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। যে যেখানে পারেন সেখানেই দাঁড়িয়ে জানাযায় যোগ দিয়েছেন। জানাযার আগে বেগম জিয়ার দীর্ঘ জীবন নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এছাড়া মায়ের জন্য দোয়া ও পরিবারের পক্ষে সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন বড় ছেলে তারেক রহমান। মা বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া চাওয়ার মুহূর্তে পুরো এলাকায় নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। দেশনেত্রীর বিদায়ে শোক যেন একযোগে ছুঁয়ে যায় সবাইকে।
এ জানাযায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকাস্থ প্রায় অর্ধষত দেশের প্রতিনিধিরা জানাযায় অংশ নেন। নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তারা প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন বিদায়। জানাযায় নারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। মূল স্থানে প্রবেশ সীমিত থাকলেও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জানাযা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় গণজমায়েত। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবাস ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্ষমতার বাইরে থেকেও কীভাবে একজন নেতা গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেন, এই বিদায় তারই প্রমাণ।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দাফন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার বিকেলে জানাযা শেষে তাকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি ও তার স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। দাফন শেষে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা মরহুমার প্রতি সশস্ত্র সালাম জানান। এর আগে কফিনের গাড়ি যাওয়ার সময় সড়কের দুপাশে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে প্রিয় নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। সেসময় এলাকাজুড়ে শোক ও নীরবতার আবহ বিরাজ করে।
দাফন কার্যক্রমে তারেক রহমান : বিকেল সোয়া ৪টায় জিয়া উদ্যানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে খালেদা জিয়াকে শায়িত করার কাজ শুরু হয়। খালেদা জিয়ার কবরে সবার আগে নামেন বড় ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিজ হাতে তিনি তার মমতাময়ী মাকে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করেন। মাকে কবরে শায়িত করে বিকেল সাড়ে ৪টার কিছুক্ষণ পর উঠে আসেন তারেক রহমান।
কবরে শায়িত করার পর মায়ের কবরে সবার আগে মাটিও দেন তারেক রহমান। এছাড়া তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপির শীর্ষ নেতারা কবরে মাটি দেন।
সেখানে কিছুটা দূরে অবস্থান করেন তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান, আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান, তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানসহ পরিবারের নারী সদস্যরা। দোয়া পড়ে একটি পাত্রে নেওয়া মাটিতে স্পর্শ করতে দেখা যায় তাদের। দাফন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা দায়িত্ব পালন করেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কফিন কাঁধে নিলেন মাওলানা আজহারী : বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার জানাযা শেষে খালেদা জিয়ার কফিন কাঁধে তুলে নিতে দেখা যায় জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ইসলামিক বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারীকে। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।
জানাযায় বিশিষ্টজন : বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কূটনীতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
জানাজায় প্রথম কাতারে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ডান পাশে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও বামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ছিলেন। তারেক রহমানের ডান পাশে পর্যায়ক্রমে আরও উপস্থিত ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও তিন বাহিনীর প্রধানরা। তারেক রহমানের বাম পাশে পর্যায়ক্রমে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, বিএনপি নেতা অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি তার সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার, এম সাখাওয়াত হোসেন, পীর সাহেব চরমোনাই রেজাউল করিম, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকেও জানাযায় দেখা গেছে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকও জানাজায় অংশ নেন। তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে সহমর্মিতা জানান তিনি।
ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার নামাজে জানাযায় জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণকারী অন্য সদস্যগণ হলেন নায়েবে আমীর, সাবেক এমপি মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোঃ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আবদুর রহমান মুসা, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি জনাব কামাল হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতৃবৃন্দ।
ভবনের ছাদেও অংশ নেন অনেকে : কোটি মানুষের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে খালেদা জিয়ার জানাযা সম্পন্ন হয়েছে। জানাযায় ছিল না তিল পরিমাণ জায়গা। জায়গা না পেয়ে মেট্রোরেল স্টেশন, আশপাশের বাসা-বাড়ির ছাদ থেকেও জানাযায় অংশ নিতে দেখা যায় অনেককে। জানাযার জন্য যখন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, বিজয় সরণি, আগারগাঁও, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ, আসাদগেট, আড়ং মোড়সহ আশপাশের এলাকা জনস্রোত, তখন এসব এলাকার ভবনগুলোর ছাদে জানাযার নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে অনেককে। এছাড়া আশপাশের সব সড়ক, অলিগলি থেকে অজস্র মানুষ জানাযায় অংশ নিয়ে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করেন।
সংসদ ভবনের পূর্ব পাশে থাকা একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী আলিমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, বাসার অনেকেই সকাল থেকে ছাদে অবস্থান নেন। বাসার অনেকের আত্মীয় এসে উঠেছেন এখানে। তারা সবাই ছাদ থেকে জানাযা নামাজ আদায় করেন।
পতাকা মোড়ানো গাড়িতে খালেদা জিয়া : খালেদা জিয়ার লাশ গতকাল সকাল ৯টা ১৭ মিনিটের দিকে বাংলাদেশের পতাকায় মোড়ানো একটি গাড়িতে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানে নিয়ে যাওয়া হয়। খালেদা জিয়ার কফিনে তার দীর্ঘদিনের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নেওয়ার কথা ছিল। তবে গাড়িটি তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন তারেক রহমান। সেখানে পরিবারের সদস্যরা ও আত্মীয়-স্বজনরা তাকে শেষবারের মতো একনজর দেখে শ্রদ্ধা জানান।
বেলা ১১টা ৫ মিনিটে গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসভবন থেকে খালেদা জিয়ার কফিন নিয়ে বড় ছেলে তারেক রহমান জানাযাস্থল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উদ্দেশে রওনা হন। গাড়িবহরে লাল সবুজ রঙের বাসটিও ছিল। তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা জানাযাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
ডিডিওচিত্র প্রদর্শন : বুধবার দুপুরের আগ থেকেই বিজয় সরণি সংলগ্ন এলাকা থেকে জানাযাস্থল ও আশপাশের এলাকায় স্থাপিত একাধিক জায়ান্ট স্ক্রিনে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রিয় নেত্রীর এসব বক্তব্য শুনে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তে দেখা গেছে। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে শুনছেন প্রিয় নেত্রীর কণ্ঠ। মাইকে প্রচারিত বক্তব্যগুলোর মধ্যে ছিল ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশ, দেশের মাটি-মানুষ আমার সবকিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাবো না’। ‘আমি যতক্ষণ বেঁচে থাকবো, দেশবাসীকে ছেড়ে যাবো না’। এই লাইন শুনেই অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। খালেদা জিয়ার প্রচারিত বক্তব্যের মধ্যে আরও রয়েছে, ‘আমরা সকলকে বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই। তবে, কেউ যদি বন্ধু বেশে প্রভু হতে চায়, সেটা আমরা মেনে নেবো না। আমরা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছি। এখন যদি দেশকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করা লাগে, আমরা করবো।’ ‘দেশ বিক্রি চলবে না হাসিনার। দেশ রক্ষা করতে হবে ইনশাআল্লাহ।’ ‘আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকিÍ কিন্তু দেশবাসীকে ছেড়ে যাবো না। দেশবাসীর কাছে আমার আবেদন, আপনারা আমাকে আলাদা করে দেবেন না।’
আপ্লুত জনতা : অকৃত্রিম ভালোবাসায় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠা খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানাল লাখ লাখ মানুষ। অসীম অনন্ত লোকে পাড়ি জমানোর সময় কোটি মানুষের ভালোবাসা সঙ্গী করে নিয়ে গেলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। খালেদা জিয়ার জানাজাকে কেন্দ্র করে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়েছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও বিজয় সরণি এলাকায়। জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠছে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ। প্রিয় নেত্রীর এসব বক্তব্য শুনে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তে দেখা গেছে। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে শুনছেন প্রিয় নেত্রীর কণ্ঠ।
ঢাকার রাস্তা লোকে লোকারণ্য : রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বুধবার বেলা ৩টা ৫ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়ার জানাযা শেষ হয়। জানাযায় অংশ নিতে মানুষের ঢল নামে। জানাযায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও এর আশপাশ এলাকায় সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকে বিপুল মানুষ। সরেজমিন দেখা যায়, সংসদ ভবন এলাকাসহ এর আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা ছাড়িয়ে যায় জানাযা। সংসদ ভবন এলাকা থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার পর্যন্ত সড়কে বিপুল মানুষ জানাযায় অংশ নেন। এ ছাড়া আসাদ গেট থেকে মোহাম্মদপুর টাউন হলের কাছাকাছি পর্যন্ত, আগারগাঁও মেট্রো স্টেশন থেকে শিশু মেলার (শ্যামলী) কাছাকাছি পর্যন্ত এলাকার সড়কে বিপুল মানুষ জানাযায় অংশ নেন। কালো পোশাক ও ব্যাজ পরে, দলীয় পতাকা হাতে খালেদা জিয়ার জানাযাস্থলে জড়ো হন মানুষ।
সেই সংসদে ফিরলেন নিথর দেহে : শীতের কুয়াশাভেজা সকালে চারদিকে পিনপতন নীরবতা, শুধু মানুষের ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দ। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ আর জাতীয় সংসদ ভবনের আঙিনা আর কোনো রাজনৈতিক স্লোগানে মুখর নয় বরং এক গভীর শূন্যতায় আচ্ছন্ন। মানুষের মুখে শোক আর নিস্তব্ধতার ছায়া। যে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য বেগম খালেদা জিয়া রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯৯১ সালে দেশের শাসনভার সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরিয়ে এনেছিলেন- আজ সেই সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাতেই তিনি ফিরলেন, তবে একেবারেই অন্যভাবে। পতাকায় মোড়ানো এক হিমশীতল ফ্রিজার ভ্যানে, নিথর দেহে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে যে গণতন্ত্রের ভিত্তি তিনি গড়েছিলেন, গতকাল সেই গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু সংসদ ভবনেই তার শেষ বিদায়ের সুর বেজেছে।
১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই সংসদ ভবনেই খালেদা জিয়া শপথ নিয়েছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্রের পতাকা ওড়াতে। আজ কয়েক দশক পর, সেই পতাকাতলে শেষবারের মতো চিরবিদায় নিতে এলেন তিনি। সংসদ ভবনের পাথুরে দেয়ালগুলো যেন আজ সাক্ষী হয়ে আছে এক মহীয়সী নারীর উত্থান, সংগ্রাম এবং এই বিষাদময় প্রস্থানের। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছে তাদের প্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখতে। কেউ হেঁটে, কেউ মেট্রোরেলে, কেউবা শেষ সম্বলটুকু খরচ করে ঢাকায় এসেছেন শুধুমাত্র জানাযায় শরিক হতে।
সেনাবাহিনীর তৈরি হিউম্যান চেইনের ভেতর দিয়ে যখন তার কফিনবাহি গাড়িটি ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল, তখন দুই ধারের মানুষের চোখে ছিল বাঁধভাঙা পানি। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনটি মনে করিয়ে দিচ্ছিল, তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, ছিলেন এই রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জানাযা শেষ করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চন্দ্রিমা উদ্যানে। যেখানে তার স্বামী, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চিরনিদ্রায় শায়িত। যে মানুষটি আজীবন গণতন্ত্রের জন্য আপস করেননি, যিনি কারাবরণ করেছেন কিন্তু মাথা নত করেননি, গতকাল তিনি ফিরে গেলেন তার জীবনসঙ্গীর পাশেই।
সংসদ ভবন এলাকা শুধু ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, বরং এক শোকাতুর ইতিহাসের সাক্ষী। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক আর সাধারণ ছুটির আবহে স্তব্ধ পুরো বাংলাদেশ। যে সংসদীয় ব্যবস্থা তিনি পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন, সেই ব্যবস্থার ধারক হয়ে সংসদ ভবনের স্মৃতি মেখেই বিদায় নিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অনন্য কারিগর হিসেবে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাযা : দেশি-বিদেশি কোটি মানুষের অংশগ্রহণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাযা শেষ হয়েছে। জানাযা নিয়ে নেটিজেনরা নানান অনুভূতি প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ এই জানাযাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা বলে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জুনায়েদ আহমেদ লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার জানাযা সম্পন্ন, শেষ বিদায়ে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ।’ আসাদুজ্জামান নূর লিখেছেন, ‘মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি-শাহবাগ-চীন মৈত্রী সব ক্রস করে গুলিস্তানের দিকেও জানাযার লাইন চলে যাচ্ছে।’ মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ লিখেছেন, ‘দেশকে ভালোবাসলে দেশ তা বহুগুণে ফিরিয়ে দেয়। যদ্দুর খবর পেয়েছি মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে শ্যামলী, আগারগাঁও, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডি-কলাবাগান পর্যন্ত। তিনি ছিলেন দেশনেত্রী, আজ দেশ তার জানাযায় দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশপন্থী রাজনীতিবীদের জীবন কতটা মহিমান্বিত হতে পারে তা আমরা এগারো দিনে দুইবার দেখতে পেলাম। জীবিত সকল রাজনীতিবীদের জন্য এরচেয়ে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে?’ গিয়াস উদ্দিন মিয়া লিখেছেন, ‘বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন প্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামাযে জানাযায়।’ খালিদ সাইফুল্লাহ লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাযা। আপসহীন নেত্রীকে আল্লাহ্ জান্নাত নসিব করুক!’ মাকামে মাহমুদ লিখেছেন, ‘মহান আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেন তাকে এভাবেই সর্বজনীন করেন। আব্দুল্লাহ তারেক লিখেছেন, ‘সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে বড় জানাযার দৃশ্য এটি। এই দৃশ্য দেখে ঈর্ষা ভরা মন নিয়ে সবচাইতে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন একজন, তার নাম আজ আর উল্লেখ নাই করলাম। এটি আবারো প্রমাণ হলো, আল্লাহ যদি কাউকে সম্মান দিতে চান তবে তা ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই। আল্লাহু আকবার। আল্লাহ মরহুমাকে ক্ষমা করে দিন, জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।’
জনসমুদ্র শব্দটিও যেন এই বিশালতার কাছে ম্লান হয়ে যায়। যেদিকে চোখ যায়, শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। লাখো কণ্ঠে কান্নাজড়িত দোয়া ও নীরব শোক পুরো এলাকাকে ভারী করে তোলে। মাইকের আওয়াজ যতদূর পৌঁছেছে, তার থেকেও বেশি দূরে মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাযায় শরিক হন। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কেউবা হাত তুলে নীরবে প্রার্থনায় মগ্ন ছিলেন।
পুরান ঢাকার সত্তরোর্ধ্ব ব্যবসায়ী হাজি আবদুল লতিফ বলেন, ১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাযা দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, এমন দৃশ্য আর দেখব না। আজ তার স্ত্রীর জানাযায় এসে মনে হচ্ছে ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে। ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না, এটা আল্লাহর দান। জানাযায় শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাই নন, অংশ নেন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ।
দুপুর ১২টার পরে খালেদা জিয়ার কফিন জাতীয় পতাকায় মোড়ানো গাড়িতে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছায়। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে লাল-সবুজ পতাকায় মোড়ানো ফ্রিজার ভ্যানে করে তার কফিন জানাযাস্থলে নেওয়া হয়। জানাযা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
জানাযায় একজনের মৃত্যু : খালেদা জিয়ার জানাযায় অংশ নিতে এসে অসুস্থ হয়ে মো. নিরব হোসেন (৫৬) নামে এক ব্যক্তি মারা যান। তার বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। বুধবার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পশ্চিম পাশে জানাযা অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জানাযা শুরুর আগেই বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। একপর্যায়ে ভিড়ের চাপ বেড়ে গেলে নিরব হোসেন (৫৬) অসুস্থতা অনুভব করেন। পরে মাটিতে পড়ে যান। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে পথেই তার মৃত্যু হয়।
শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক(এসআই) মো. শরিফ জানান, খালেদা জিয়ার জানাযায় অংশ নিতে এসে নিরব হোসেন নামের ওই ব্যক্তি মারা যান। জানাযার সময় মানুষের প্রচ- ভিড় ছিল। আর মৃত ব্যক্তি অসুস্থ ছিলেন।
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর দেখা দেয় নিউমোনিয়া, সঙ্গে কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের পুরনো সমস্যা। হাসপাতালে ভর্তির পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিউ) নেওয়া হয় তাকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।