ইরানের ওপর ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ আগ্রাসী শক্তির ‘সরাসরি নিন্দা’ করবে বা এর প্রতিবাদ করবে বলে তারা প্রত্যাশা করেন। গতকাল বুধবার ঢাকায় ইরান দূতাবাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি এসব কথা জানান।
বাংলাদেশ সরকার ইরান ইস্যুতে দুটি বিবৃতি দিয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি বিবৃতি আমরা দেখেছি। তবে আমরা আশা করি যে বাংলাদেশ যেহেতু ইসলামিক একটি দেশ, মুসলিম একটি দেশ, ওআইসিসহ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ন্যামের সদস্য দেশ, সেই হিসেবে বাংলাদেশ আগ্রাসী শক্তির সরাসরি নিন্দা করবে বা এর প্রতিবাদ করবে, এরকম আমরা আশা করি।
ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি বলেন, ‘আমরা কোনো দেশের কাছ থেকে কোনো লজিস্টিক সাপোর্ট চাই না। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ড্রোন ও মিসাইলসহ প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি রয়েছে। আমরা শুধু চাই যে একটি মুসলিম দেশ আক্রান্ত একটি মুসলিম দেশের প্রতি তাদের সহানুভূতি এবং সমর্থন প্রকাশ করবে’, যোগ করেন রাষ্ট্রদূত। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি বলেন, ইরান শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি রয়েছে। কোনো আগ্রাসী শক্তির কাছে ইরান মাথা নত করবে না। ‘ইরান সর্বশক্তি দিয়ে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না আমেরিকা শান্তির পথে আসে।’ প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থানরত আমেরিকান নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
আমেরিকার নাম উল্লেখ না করে ঢাকার সাম্প্রতিক বিবৃতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৮০০ মানুষ শাহাদাত বরণ করেছে। সর্বোচ্চ নেতা খামেনি শেষ পর্যন্ত মানুষের পাশে ছিলেন, তিনি পালিয়ে যাননি। চীনের সঙ্গে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি না থাকায় তারা সরাসরি পাশে দাঁড়াতে পারছে না।’
ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদী। তিনি বলেন, কত সংখ্যক বাংলাদেশী ইরানে আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে আমার হাতে নেই। তবে আমি এতটুকু জানি, তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে।
রাষ্ট্রদূত আশা প্রকাশ করেন, একটি মুসলিম দেশ হিসেবে সকল মুসলিম দেশের উচিত আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো এবং তাদের ভূখ- বা সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে অন্য দেশে হামলার অনুমতি না দেওয়া। এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন যথেষ্ট শক্তিশালী। আমেরিকা-ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের এগুলো মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যতদিন যুদ্ধ চালাতে চাই, চালাতে সক্ষম।
আয়াতুল্লাহ খামেনি হত্যাকা-কে ‘কাপুরুষচিত’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমাদের সর্বোচ্চ নেতা কোনো বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্রে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি অফিসে কাজ করছিলেন। হঠাৎ সেখানে আক্রমণ করে তাকে শহীদ করা হয়েছে। এটি ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা নয়, বরং শুধুমাত্র আমেরিকা ও ইসরাইলের নিকৃষ্ট পরিকল্পনা।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ইরান কখনো ইসরাইলের প্রতি আগ্রাসী হবেনা। তবে যে কোনো আগ্রাসনের ক্ষেত্রে আমরা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত প্রতিরোধ করব। অপমানজনক বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু শ্রেষ্ঠ। ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, বর্তমান নেতৃত্ব তিন সদস্যের একটি কমিটি নিয়ন্ত্রণ করছে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্য। নতুন নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব তাদের এক্সপার্ট কাউন্সিলের। আশা করা যায় অল্প দিনের মধ্যেই ফলাফলে পৌঁছানো হবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো স্লোগান দেয়নি। শহীদ আয়াতুল্লাহর পরে লক্ষ লক্ষ ইরানী রাস্তায় নেমেছে। ইরানীরা জাতীয়তাবাদী; বাইরের আগ্রাসনের মুখে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়। রাষ্ট্রদূত বলেন, যখনই কোনো ধরনের সহযোগিতা চাওয়া হবে বা কোনো বিষয় ইরান সরকারকে জানানো হবে, অবশ্যই সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, আমরা ইরানী বা বিদেশী-এভাবে পার্থক্য দেখি না। আমাদের দেশে বর্তমানে যারা অবস্থান করছেন, তাদের যেকোনো সমস্যায় সমাধানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সমানভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।