গুমের শিকার হয়ে 'দ্বিতীয় জীবন' পাওয়া বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বীন কাশেম সংসদে গুমের শিকার পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি চাঁদাবাজদের কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় না দেওয়ার জন্য সব সংসদ সদস্যের প্রতি শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
নিজের গুম হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বীন কাশেম বলেন, আমি মনে করেছিলাম যেহেতু দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি, আমার পরিবার-সন্তানেরা আমাকে আটটি বছর পায়নি, তাই তাদের নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাব। যে দেশ আমাকে অধিকার দিতে পারে না, সেখানে থাকবো না। কিন্তু যখন যুবদল নেতা সাজু ইসলাম সুমন ভাইয়ের মেয়ে কিংবা মোহাম্মদ পারভেজ ভাইয়ের মেয়ের চোখের দিকে তাকাই, যারা এখনো বাবার জন্য অপেক্ষা করে আছে, তখন আর যেতে পারি না।
তিনি বলেন, আমরা এখনো শক্তিশালী অপশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলছি, যারা এখনো বিদ্যমান। আমাদের এই কথা বলা তাদের অসুবিধার কারণ, আমাদের জীবনের ঝুঁকি এখনো রয়েছে। কিন্তু গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কান্না এই রাষ্ট্রে এখনো বিদ্যমান। রাষ্ট্র তাদের কোনো জবাব দিতে পারেনি।
সংসদে দাঁড়িয়ে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন এই সংসদ সদস্য:
প্রথমত, জবাবদিহিতা ও স্বীকৃতি: যাদের গুম করা হয়েছে, তারা এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। গুমের সঙ্গে জড়িত অনেকেই এখনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিদ্যমান এবং আইনের আওতার বাইরে থেকে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই বিচার যেন ফ্যাসিস্ট আমলের মতো লোক দেখানো নাটক না হয়।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক পুনর্বাসন: গুমের শিকার পরিবারগুলো যা হারিয়েছে তা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। তবে তারা যেন অর্থনৈতিক কষ্টে না ভোগে, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। একটি ব্রিজ বানানোর অর্থ দিয়ে অসংখ্য পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব। অবিলম্বে তাদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, গুম রোধে কঠোর আইন ও কমিশন গঠন: এমন মানবতাবিরোধী অপরাধ যেন বাংলায় আর না ঘটে, সেজন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন গঠন করতে হবে, যারা কারও রক্তচক্ষুর পরোয়া করবে না।
এছাড়া তিনি গুম হওয়া ব্যক্তিদের আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আইনমন্ত্রীর কাছে একটি বিশেষ আইন প্রণয়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে বা কোনো দাপ্তরিক কাজে পরিবারগুলো হয়রানির শিকার হচ্ছে। কারণ আইনে তারা জীবিত নাকি মৃত তার কোনো স্বীকৃতি নেই।
ঢাকা-১৪ আসনের উন্নয়ন ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজের ঘোষণা:
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার সমস্যাগুলোও তুলে ধরেন মীর আহমাদ বীন কাশেম। তিনি বলেন, আমার এলাকার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন একটি পানিবন্দী জনপদ। ৫৪ বছরেও সেখানে সড়ক যোগাযোগ হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যে সেখানে ব্রিজ নির্মাণের কাজ শুরুর দাবি জানাচ্ছি।
মিরপুরের শাহ আলী মাজারের সম্পত্তি নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অবৈধ কর্মকা- চলছে উল্লেখ করে তিনি এগুলো বন্ধে ধর্মমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
নিজেকে 'খেটে খাওয়া গরিব মানুষের এমপি' উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে সামান্য টাকা আয় করে, সেখান থেকেও তাদের চাঁদা গুনতে হয়। গুটিকয়েক চাঁদাবাজ লক্ষ লক্ষ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে, কারণ তাদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে।’
সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমি ঢাকা-১৪ আসনে কোনো চাঁদাবাজকে প্রশ্রয় দেব না। আসুন আমরা শপথ নিই, যারা মানুষের হক নষ্ট করে, আমরা তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেব না। ৫ বছরের দলীয় স্বার্থ নয়, বরং আগামী ৫০ বছরের জাতি গঠনের কথা চিন্তা করে আমাদের দেশ চালাতে হবে।’