বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোতে গভীর শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণ যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার সাথে পালিত হয়। গত শনিবার ইতালি, পর্তুগাল, বাহরাইন, কাতার, লন্ডন, টোকিও, মালয়শিয়া বাংলাদেশ দূতাবাসে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ পালিত হয়েছে। দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোতে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এর শুভেচ্ছা ও শহীদের স্মরণ বাণী পাঠ করা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি প্রদত্ত ভিডিও বার্তা সম্প্রচার এবং মহাসচিব এর বাণী পাঠ করা হয়। বিদেশে বসবাসরত বিভিন্ন প্রবাসী নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশী নাগরিকবৃন্দ অমর একুশের চেতনা ও তাৎপর্য গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁরা ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হিসেবে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর নেতৃত্বে নতুন সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচিকে তারা স্বাগত জানান।
ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত: ইতালির রাজধানী রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস যথাযোগ্য মর্যাদায় “শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬” পালন করেছে। রোমের আইজাক রবিন পার্কে স্থায়ী শহীদ মিনারে দিবসের প্রথম প্রহরে দূতাবাসের পুষ্পাঞ্জলী অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। অতঃপর দূতাবাস চত্বরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সংগে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং দূতাবাস প্রাঙ্গণের অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্যায়ে দূতাবাসের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী, বিভিন্ন প্রবাসী নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীগণ, বিভিন্ন সামাজিক, ও ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ও বন্ধু প্রতিম ইতালিয়ান নাগরিকদের অংশগ্রহণে দূতাবাসের সম্মেলন কক্ষে একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রদূত রকিবুল হক তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অমর একুশের ঐতিহাসিক ভূমিকার উপর আলোকপাত করেন।
মালয়েশিয়ায় গভীর শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণ: মালয়েশিয়ায় যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান ভাষা শহীদদের স্মরণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন, কুয়ালালামপুর অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ১৯৫২ সালের অমর একুশের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। প্রথমেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী। এরপর শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। প্রথম সচিব (বাণিজ্য) প্রণব কুমার ঘোষের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় যারা বুকের রক্ত দিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ভাষার জন্য জীবন বিসর্জনের এ ঘটনা শুধু বাঙালি জাতির গর্ব নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ভাষাপ্রেমী মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা।
পর্তুগালে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত: পর্তুগালে গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলাদেশ দূতাবাস, লিসবন-এর উদ্যোগে এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ০১ মিনিটে লিসবনের স্থায়ী শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়। এ সময় দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং প্রবাসী বাংলাদেশীরা উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে দূতাবাসের হেড অব চ্যান্সারি (এইচওসি) এস এম গোলাম সারওয়ার বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নয়; এটি বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেই আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
বাহরাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন: বাহরাইনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছে। গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে দূতাবাস প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি উদ্বোধন করেন বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. রইস হাসান সরোয়ার। পরে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বাহরাইনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
মুম্বাইয়ে উপ-হাইকমিশনে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত: মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন আজ যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছে। পতাকা উত্তোলন, পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনার ফারহানা আহমেদ চৌধুরী সকালে চ্যান্সারি প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার মধ্য দিয়ে দিবসের কার্মসূচি শুরু হয়। অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় বাজানো হয় অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ ভাষা শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
আলোচনা সভায় উপ-হাইকমিশনার ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক পথ নির্দেশক অধ্যায়, যা জনগণের পরিচয়, সংস্কৃতি, স্বকীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার দৃঢ় সংকল্প, এমনকি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতিফলন।
টোকিও বাংলাদেশ মিশনে মহান শহীদ দিবস পালন: জাপানের রাজধানী টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের স্মরণে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজনের মধ্যদিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছে। এখানে প্রাপ্ত এক বার্তায় জানানো হয়, ভোরে টোশিমা সিটির ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কে স্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী দূতাবাসের কর্মকর্তা ও টোশিমা সিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং প্রবাসী বাংলাদেশীরাও প্রভাতফেরির মাধ্যমে শহীদদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে দূতাবাস প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রদূত দিবসের আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন। আলোচনা সভায় অমর একুশের ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং আজ তা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এটি সব জাতিকে নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে অনুপ্রাণিত করে।