সংগ্রাম ডেস্ক

‘আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজ’ নামে নতুন একটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিষয়ক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক কমিটির প্রধান ড. দিলারা চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফাহিম মাশরুর।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সদস্য রুবি আমাতুল্লাহ প্ল্যাটফর্মটির ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং এর উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকার তুলে ধরেন। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আধিপত্যবাদের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণ ও রাষ্ট্রকে সচেতন করা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্মিলিত প্রয়াস গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটির আহ্বায়ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তিত আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। তিনি দেশের সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান যাঁরা স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা, গণতান্ত্রিক আত্মশাসন এবং শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাস করেন, তাঁরা যেন এই নাগরিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ‘নতুন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব কৌশল’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কয়েকজন রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অংশ নেন। এ পর্বে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী।

আলোচনায় অংশ নেন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ, দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক ও সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির, জনতার দলের ডেল এইচ খান, রাষ্ট্র সংস্কারের দিদার ভূঁইয়া এবং রাজনীতিবিদ রিতা রহমান।

মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন একদিকে যেমন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে ছিল, অন্যদিকে তেমনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও ছিল। ভারত যদি শেখ হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া থেকে বিরত না থাকে, তাহলে প্রমাণ হবে যে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে তার আধিপত্যবাদী অবস্থান এখনো পরিবর্তন করেনি।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা না বাড়ালে সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। দেশে নিজস্ব ড্রোন তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং চিকেন নেক-কেন্দ্রিক সামরিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। তবে এর মূল উদ্দেশ্য নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কাউকে আক্রমণ করা নয়। তিনি জুলাই জাদুঘর থেকে ফেলানীর ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার সমালোচনা করেন।

সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, দেশের বেশিরভাগ খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি যদি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব সবসময় ঝুঁকিতে থাকবে।

ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে বাংলার সম্পদ লুট করার জন্য সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করেছিল, সেই ধারাবাহিকতায় লুটপাট ও অর্থনৈতিক বৈষম্য টিকিয়ে রাখার জন্য আধিপত্যবাদের রূপ পরিবর্তন হয়েছে, ধরন পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে আগের আধিপত্যবাদী শক্তিকে ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠান শেষে ‘আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজ’-এর সাত সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। কমিটির আহ্বায়ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী।

কমিটির সদস্যরা হলেন মানবাধিকার ও সমাজকর্মী এবং গবেষক রুবি আমাতুল্লাহ; সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির; উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাসরুর; সাবেক কূটনীতিক সাকীব আলী; অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা খান মুখলেছুর রহমান; এবং অ্যাক্টিভিস্ট মিনহাজুল আবেদীন।