* শ্রমিকদের জন্য জরুরি হটলাইন চালু
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে বিশ্বে। উপসাগরীয় ছয়টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকায় সংঘাত ছড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যেও। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যে তীব্র সামরিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে আটকা পড়েছে হাজারো বিদেশি নাগরিক। বিশেষ করে সেসব দেশে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিক ও পর্যটকরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন। পরিস্থিতি মানবিক দিক থেকে উদ্বেগজনক, নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার সংকটও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিটেন্স। বর্তমানে প্রায় ৭০ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনির টাকায় সচল রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক চাকা। তবে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত এই স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। নিরাপত্তা, জ্বালানি ও শ্রমবাজারে বাড়বে অনিশ্চয়তা। সরাসরি প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর। বহুমুখী সংকটে দেশগুলোতে থাকা লাখ লাখ কর্মী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এরই মধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দুবাইয়ে একজন ও বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এছাড়া বহু বাংলাদেশি কর্মী উপসাগরীয় দেশগুলোতে উড়োজাহাজের টিকিট কেটেও দেশে আসতে পারছেন না। আবার বাংলাদেশে ছুটিতে এসে বিপাকে পড়েছেন বহু কর্মী। বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে। এই ছয়টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। সবশেষ ২০২৫ সালে এই দেশগুলোতে শ্রমিক গেছে ৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৫ জন। বিএমইটির একটি সূত্র বলছে, এই ছয়টি দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক বর্তমানে কাজ করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এবং অভিবাসন খাতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। যেহেতু আমাদের অর্থনীতি অনেকাংশেই রেমিটেন্সের ওপর দাঁড়িয়ে, তাই প্রবাসী কর্মীরা যদি টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয় বা গণহারে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়, তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়বে। জনশক্তি রপ্তানিকারক সংগঠন ‘বায়রা’-র মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জাপান বা কোরিয়ার মতো দেশগুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এদিকে, অভিবাষণ বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে সউদী আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ করে ভিসার মেয়াদ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের আহ্বান জানানো হয়েছে। জানা যায়, ইতিমধ্যেই সরকার একটি বিশেষ ‘সেল’ গঠন করেছে যাতে যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় বিমানবন্দরগুলোতে আটকে পড়া প্রবাসীরা দ্রুত এবং নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা দাবি করছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসেছেন আরব আমিরাত প্রবাসী শরিফুল ইসলাম। তিন মাসের ছুটি শেষে চলতি (মার্চ) মাসের ১ তারিখ ফিরতি ফ্লাইট ছিল তার। বলেন, ‘হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় ঢাকা থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। এখন আবার কবে তারা পুনরায় ডেট দেবে কিছুই জানি না। সবার সঙ্গে কথা বলে জানলাম, অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন লাগতে পারে। টাকা-পয়সাও শেষ হয়ে গেছে, ঋণ করে চলছি।
সৌদি আরব প্রবাসী মঙ্গল মিয়া ও গালিব মিয়া বলেন, ‘আমার আকামার মেয়াদ শেষ হবে মার্চের ২০ তারিখ। এ সময়ের আগে যেতে না পারলে আমি ভিসা রিনিউ করতে পারবো না। পরে অবৈধ হয়ে যাবো। এক্ষেত্রে কোম্পানি যদি মেয়াদ না বাড়ায় আমরা বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবো।’ এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা শ্রমিকরা জানান, বাইরে যারা ক্লিনারের কাজ করেন তারা নিরাপত্তা শঙ্কায় আছেন। এছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা কারখানা ও বাসাবাড়িতে কাজে থাকা কর্মীরা নির্বিঘেœ কাজ করলেও ছুটি নেই। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুজন শ্রমিক নিহত হওয়ার পর ভয় ও শঙ্কা বেড়েছে। তবে সবাই তাদের ডিউটি পালন করছেন নির্বিঘেœ। এদিকে বিদেশে থাকা বহু শ্রমিক দেশে ঈদ উদযাপনের জন্য আগে থেকে বেশি দামে টিকিট কেটে রেখেছেন। যুদ্ধের কারণে তাদের ঈদের আগে দেশে আসা প্রায় অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেমিটেন্স যোদ্ধাদের এই সংকট কেবল তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির অস্তিত্বের লড়াই। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামানো বাংলাদেশের হাতে না থাকলেও, বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি এবং বর্তমান প্রবাসীদের কর্মস্থল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, দেশের অর্থনীতির মেরুদ- হিসেবে পরিচিত এই রেমিটেন্স প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন তারা।
বাহরাইনে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসী কয়েকজন শ্রমিক ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তারা ভালো আছেন। তবে কাজের সময় ছাড়া কম সময়ই বাইরে যাওয়া হয়। ঈদ আসছে। দেশে বড় অংকের টাকা পাঠাতে পারছি না। ব্যাংকে যাওয়া ঝামেলা, বিকাশে বেশি টাকা পাঠানোও ঝামেলা।’
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে নির্মাণ, অবকাঠামো ও সেবা খাতে প্রকল্পের গতি কমে যেতে পারে। এতে নি¤œ ও আধাদক্ষ শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। কাজের সময় কমানো, ওভারটাইম বন্ধ হওয়া কিংবা চুক্তি নবায়ন না হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে শ্রমিকদের আয় কমে যেতে পারে। তারা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে দেশে পাঠানো টাকার পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি, ভোগব্যয় ও ব্যাংকিং খাতে তারল্যে চাপ তৈরি হতে পারে।
অভিবাসন ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সাবু বলেন, ‘পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝে কিছুদিন পর হয়তো সেটা টের পাওয়া যাবে। তবে আশা করছি, আমাদের শ্রমিকরা দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি সংকটে পড়বে না। এর আগে কোভিডেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। এখন সাময়িক রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ ভিন্ন পথে টাকা পাঠাতে অভ্যস্ত। তবে যুদ্ধটা আরও কিছুদিন বাড়লে আগামী দু-তিন মাস আমাদের কর্মী যাওয়ার সংখ্যা অনেক কমে যাবে। তবে যারা এখন ইকামাসহ নিয়োগপত্র বর্ধিত করার নানান ঝামেলায় ভুগছেন তাদের সমস্যা এসব দেশ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের হাইকমিশনকে আন্তরিক আচরণ করতে হবে।’
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিকদের জন্য জরুরি হটলাইন চালু: ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনো বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী সমস্যার সম্মুখীন হলে তা জানাতে একটি সার্বক্ষণিক হটলাইন চালু করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গত ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। যোগাযোগের মাধ্যম ও হটলাইন বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কোনো প্রবাসী কর্মী সমস্যার সম্মুখীন হলে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সার্বক্ষণিক হটলাইন নম্বরে (+৮৮০১৯৬১০১২০৩০) যোগাযোগ করতে পারবেন। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে: ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া (মহাপরিচালক, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড): মোবাইল- +৮৮০১৮১৯২৬০৫৪৫, ই-মেইল- [email protected]। আশরাফ আহমেদ রাসেল (উপসচিব, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়): মোবাইল- +৮৮০১৭০৫৪২৩৬৮৮, ই-মেইল- [email protected]। মো. ইমরান আহমেদ (উপসচিব ও পরিচালক প্রশাসন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড): মোবাইল- +৮৮০১৭১৪৭৬৬৭১৬, ই-মেইল- [email protected]। মো. মাসুদ রানা (পরিচালক-প্রশাসন ও অর্থ, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো): মোবাইল- +৮৮০১৭১১১১১৫৪৪, ই-মেইল- [email protected]।