চলে গেলেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক, ঢাকা ৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ওসমান হাদীর ভাই ওমর হাদী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া ওসমান হাদীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ওসমান হাদীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে লেখা হয়েছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদীকে আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।

এদিকে ওসমান হাদির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে লেখা হয়েছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন। এরআগে বিকেলে এক বার্তায় ইনকিলাব মঞ্চ জানিয়েছেল শরিফ ওসমান হাদী বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।

সমান হাদীর হামলাকারীদের দেশত্যাগে সহযোগিতার অভিযোগে গ্রেফতার সিবিয়ন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম জানিয়েছেন, ফিলিপের হয়ে তারা সীমান্ত পারাপারের কাজটি করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে রিমান্ড শুনানিতে সিবিয়ন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম এ দাবি করেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোমবার সন্ধ্যায় তাদের আটকের কথা জানায় বিজিবি। এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে হাজির করে সাত দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের মতিঝিল আঞ্চলিক টিমের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ। তার আবেদনে বলা হয়, হাদীকে গুলী করা এজাহারনামীয় আসামী ও অজ্ঞাতনামা আসামীরা অবৈধভাবে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায় মর্মে গোপনসূত্রে জানা যায়। সিবিয়ন দিউ এবং সঞ্জয় চিসিম ও তার সহযোগী অজ্ঞাতনামারা আসামীকে অবৈধ পথে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে বলে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সিবিয়ন দিউ হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি জুয়েল আড়েংয়ের ভাগ্নে। তিনি আগে থেকেই হালুয়াঘট, ধোবাউড়া ও শেরপুর এলাকায় মানুষ এবং অবৈধ মালামাল পারাপারের ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। এ চাঞ্চল্যকর মামলার এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা আসামীরা কাদের পরিকল্পনা ও পরামর্শে সীমান্ত পার হয়েছে, তা জানতে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তাদের সহযোগীদের সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য জেনে আইনের আওতায় আনা যাবে। পরিকল্পনাকারী ও অন্যান্য জড়িতদের শনাক্তকরণ, হত্যার চেষ্টায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার, ঘটনার পূর্ব পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও মদদ দাতাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের জন্য তাদের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। শুনানিতে আসামীদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। তাদের কোনো বক্তব্য আছে কি না জানতে চান বিচারক। সিবিয়ন দিউ তখন বলেন, ফিলিপের সাথে আমার আগে থেকে পরিচয়। তাকে আগে থেকেই চিনি। একটা নিউজে ফিলিপের নামে আসে। তাকে ফোন দিয়ে বললাম আপনার নাম (হাদী হত্যাচেষ্টায়) আসছে। সে দুইটা লোক পার করেছে বলে জানায়।

ফিলিপ কোথায় আছে জানেন কিনা, বিচারকের এমন প্রশ্নে সিবিয়ন দিউ বলেন, না, জানি না। ঘটনার বিষয়েও কিছু জানি না। সঞ্জয় চিসিম বলেন, ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানি না। ফিলিপের সাথে আমার কথা হয়। ঘটনার দিন রাতে ফিলিপ ফোন দিয়ে আমাকে বলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে। পরে ফোন দিলে জানায় কাজ হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করি, কী কাজ। পরে নিউজ দেখে বুঝেছি, তারা আমাদের ওখান দিয়ে গেছে। পরে আদালত দুইজনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয় বলে প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই রুকনুজ্জামান জানান। এর আগে এ মামলায় ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা হুমায়ুন কবির এবং মা হাসি বেগম বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। একই দিন ফয়সালকে গাড়ি ভাড়া দেওয়া ব্যবসায়ী মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বলকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। মঙ্গলবার ফয়সালের সহযোগী কবিরকে সাত দিন, সোমবার ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু এবং বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। এর আগের দিন রোববার গ্রেপ্তার হওয়া মোটরসাইকেল মালিক মো. আব্দুল হান্নানের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। রিমান্ড শেষে বুধবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ওসমান হাদী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদীকে গুলী করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুলীটি লাগে হাদীর মাথায়। গুরুতর আহত হাদীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার দুপুরে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। হাদীকে গুলীর ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর রাতে পল্টন থানায় এই হত্যাচেষ্টা মামলাটি করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। সেখানে আসামী হিসেবে শুধু ফয়সাল করিম মাসুদের নাম উল্লেখ করা হয়, বাকিদের দেখানো হয় ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ হিসেবে। ফয়সাল করিম মাসুদ একসময় ছাত্রলীগে যুক্ত ছিলেন। তার বাড়ি পটুয়াখালীতে। পেশাদারদের যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে তিনি নিজেকে অ্যাপেল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে দাবি করেছেন। র‌্যাব তাকে গত বছর গ্রেপ্তারও করেছিল। পরে হাই কোর্ট থেকে জামিন পেয়ে যান। তদন্তে নাম আসার পর ফয়সালের স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তার তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল সফট আইটি লিমিটেডের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। তাকে গ্রেফতারে সহায়তার জন্য ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

এর আগে পরিবার ও সহযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দোয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, আল্লাহ যেন তাকে হায়াতে তাইয়্যেবাহ নসিব করেন এবং দ্রুত সুস্থতা দান করেন। একই সঙ্গে একটি আবেগঘন বার্তায় জানানো হয় যদি ওসমান হাদী রবের ডাকে সাড়া দিয়ে শহীদের কাতারে শামিল হন, সেক্ষেত্রে দেশের স্বাধীনতাকামী মজলুম জনতাকে সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় জড়ো হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হত্যাকারীরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চলবে এবং প্রয়োজন হলে সারা বাংলাদেশ অচল করে দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি, যদি অভিযুক্ত খুনি ভারতে পালিয়ে গিয়ে থাকে, তবে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে যেকোনো মূল্যে তাকে গ্রেফতারপূর্বক দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়। ঘটনাটি ঘিরে দেশজুড়ে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।