শেরপুর সংবাদদাতা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শেরপুর জেলা শাখার সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী– ঝিনাইগাতী) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমর্থিত প্রার্থী মো: নুরুজ্জামান বাদল (৫১) ইন্তিকাল করেছেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। গত মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাত প্রায় ২ টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা হাফিজুর রহমান। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নুরুজ্জামান বাদল। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে রাত ২টার দিকে শহরের প্রবেশমুখ ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে তার অবস্থার অবনতি ঘটে এবং সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে মৃতের ভাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার মো. মাসুদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জানাযা ও দাফন: মরহুমের প্রথম জানাযা শেরপুর পৌর ঈদগাহে মাঠে গতকাল বুধবার দুপুর ২.৩০টার সময় অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা নামাযে ইমামতি করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা এটিএম মাসুম। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ অঞ্চল পরিচালক মাওলানা ছামিউল ফারুকী, শেরপুর জেলা আমীর মাওলানা হাফিজুর রহমান, শেরপুর ১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, শেরপুর ২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া ভিপি, ইসলামী ছাত্রশিবির ময়মনসিংহ মহানগরের সাবেক সভাপতি ডা. মোখলেছুর রহমান, ডা. শহিদুল্লাহ শরীফ, নেত্রকোণা ২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাওলানা এনামুল হক, নেত্রকোণা জেলা আমীর মাওলানা ছাদেক আহমেদ হারিছ, ময়মনসিংহ জেলা আমীর আব্দুল করিম, এনসিপি জেলা সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার লিখন, বিএনপি নেতা এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, মামুনুর রশিদ পলাশ, শেরপুর প্রেস ক্লাব সেক্রেটারি মাসুদ হাসান বাদল, ১১ দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
ঐদিন বিকাল ৫টায়, শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে ২য় জানাযা শেষে শ্রীবরদী পৌর শহরের ০১নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পোড়াগড় গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মরহুমকে দাফন করা হয়। দ্বিতীয় জানাযা নামাজে ইমামতি করেন মরহুমের ছোট ভাই অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার মো. মাসুদুজ্জামান।
আমীরে জামায়াতের শোক: শেরপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে জামায়াত মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী মোঃ নূরুজ্জামান বাদলের ইন্তিকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোকবানীতে জামায়াত আমীর বলেন, চিরদিনের জন্য চলে গেলেন আমাদের প্রিয় ভাই নূরুজ্জামান বাদল। শেরপুর-৩ আসনের ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী, শেরপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো: নূরুজ্জামান বাদল ভাইয়ের ইন্তিকালে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তিনি গতকাল আনুমানিক রাত ৩ ঘটিকায় কিডনি জনিত রোগে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় ইন্তিকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি স্ত্রী ও ১ পুত্রসহ বহু আত্মীয়-স্বজন রেখে গিয়েছেন।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রতি তার অঙ্গীকার ছিল অটুট। অল্প কিছুদিন আগেই নিজের চোখের সামনে রেজাউল করিমকে সন্ত্রাসীদের হাতে শহীদ হতে দেখার মতো মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েও তিনি মনোবল হারাননি। কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নির্বাচনী কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছেন- যা তার দৃঢ়তা, সাহস ও দায়িত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে মরহুমের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করার জন্য দোয়া করছি। সেই সাথে তাঁর শোকসন্তোপ্ত পরিবার, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
ব্যক্তিগত পরিচয়: নুরুজ্জামান বাদল ছিলেন শ্রীবরদী উপজেলার সকল মহলের এক পরিচিত নাম। ধর্ম-বর্ণ, জোয়ান-বৃদ্ধ সকলের কাছেই তিনি আপনজন। সততা, নৈতিকতা ও আদর্শিক রাজনীতিতে তার পদচারণা তাকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তিনি শ্রীবরদী উপজেলার সাবেক তাতিহাটী ইউনিয়ন, বর্তমানে শ্রীবরদী পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের পোড়াগড় গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। তার পিতা মরহুম মোহাম্মদ আলী, একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও শিক্ষানুরাগী। ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন এবং থানা সেক্রেটারি হিসেবেও দ্বায়িত্ব পালন করছেন । শ্রীবরদী সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে তিনি একজন। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে দূর-দূরান্তে ঘুরে ঘুরে কলেজের জন্য ছাত্র-ছাত্রী সংগ্রহ করে এই উপজেলায় শিক্ষার-আলো সম্প্রসারণে উনার অবদান অনস্বীকার্য। তার মাতা নুরজাহান বেগম। দাদা মরহুম হোসেন আলী মুন্সী। মরহুম হোসেন আলী মুন্সী অত্র এলাকার আধ্যাত্বিক মুসলিম ছিলেন। তার মাতুলালয় এতিহ্যবাহী রাণীশিমুল ইউনিয়নের তেতুলীয়া গ্রামে। নানা হাজী আব্দুল গফুর-ও [ গফুর হাজী ] ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, রানীশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক জনপ্রিয় চেয়ারম্যান, এবং কর্মজীবনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পারিবারিক ঐতিহ্যই তাকে রাজনীতি ও সমাজসেবার সাথে জড়িত করেছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা: তিনি শ্রীবরদীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শ্রীবরদী এ. পি. পি. আই. থেকে এস এস সি, শ্রীবরদী সরকারি কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। পরবর্তীতে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অফ আর্টস (বিএ) পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে গ্রেফতার হলে তিনি সেখানে আর পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। পরবর্তীতে শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সবশেষে আইন বিষয়ে ‘এলএলবি’ ডিগ্রি সমাপ্ত করেছেন।
বৈবাহিক জীবন: তিনি ১৯৯৭ সালে শ্রীবরদী উপজেলা সদরের সাতানী শ্রীবরদী মহল্লার বাসিন্দা শ্রীবরদী এ পি পি আই এর শিক্ষক জনাব মরহুম মোঃ আবেদ হোসেনের দ্বিতীয় মেয়ে নাসরিন বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রাণীবিদ্যায় মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী জনাবা নাসরিন বেগম রাণীশিমুল ইউনিয়ন গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এই দম্পতির এক পুত্র সন্তান রয়েছে।
কারাবরণ: তিনি এ পর্যন্ত ৫ বার কারা নির্যাতনের স্বীকার হন। ১৯৯৩ সালের তাকে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শ্রীবরদী সরকারি কলেজে পরীক্ষার হল থেকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে একই মামলায় দ্বিতীয়বারের মতো কারাবরণ করেন। ১৪ দলীয় জোটের সময় তিনি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৃতীয়বারের মতো কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে তিনি এ-মামলায় বেকসুর খালাস পান। ২০১৩ সালের রমজান মাসে তিনি অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন। এরপরও ষড়যন্ত্র থেমে নেই। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির ঘটনার দিন তিনি ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও তাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখিয়ে দুটি মামলায় প্রধান আসামী করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রায় সকল মামলায় উচ্চ আদালত কর্তৃক জামিন নিয়েই তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ নির্বাচন শেষ করার ১৫ দিনের মাথায় তিনি ৮/১০ টি মামলা মাথায় নিয়ে স্যারেন্ডার করেন এবং ৬ মাস কারাবন্দী ছিলেন।
এরপরেও তিনি জেল, জুলুম, নির্যাতন ও সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত তিনি শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী’র জনগণের পাশে আছেন এবং থাকবেন; কোন ষড়যন্ত্রই তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে দলমত নির্বিশেষে সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য কাজ করে গেছেন।