খুলনার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. রফিকুল হক বাবলুকে মব সৃষ্টির মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে চিকিৎসক সমাজ। আগামী মঙ্গলবারের (২১ এপ্রিল) মধ্যে তারা ডা. বাবলুকে পুর্নবহাল, মবের সাথে জড়িত স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হাসপাতালের ট্রাস্টি বোর্ডের কার্যক্রমে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধের তিন দফা দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় পরদিন থেকে চিকিৎসকরা জরুরি সেবা ব্যতীত সব ধরনের চিকিৎসা থেকে কর্মবিরতি পালন করবে।
শনিবার বেলা ১১ টায় নগরীর সাতরাস্তা মোড়ে বিএমএ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেন তারা। ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ড্যাব এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এ সময় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা বলেন, গত ১৩ এপ্রিল খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আলী আসগার লবি বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। এ সময় তার সাথে উপস্থিত স্থানীয় বিএনপি নেতা মীর কায়সেদ আলী, শেখ ইকবাল হোসেন, কাজী মিজানুর রহমান ও মোল্লা সোহাগ হোসেন তাদের অনুসারীদের নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেন। তাদের সৃষ্ট মবের মুখে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান নগরীর প্রবীণ চিকিৎসক, খুলনা বিএমএ’র সাবেক সভাপতি, খুলনা জেলা ড্যাবের সভাপতি ডা. রফিকুল হক বাবলু পদত্যাগে বাধ্য হন।
বক্তারা বলেন, বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে যে সকল অনিয়ম অব্যবস্থাপনা চালু ছিল, ডা. বাবলু দায়িত্ব নিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এতে অনিয়ম কমে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করে। ফলে অনিয়ম দুর্নীতির সাথে জড়িতদের গাত্রদাহ সৃষ্টি হওয়ায় তারা পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন জেলা ড্যাব সভাপতি ডা. রফিকুল হক বাবলু। মহানগর ড্যাব সভাপতি ডা. মোস্তফা কামালের স্ঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নেতা ড. মো. আকরামুজ্জামান, ডা. স ম গোলাম আযম, ডা. মো. ইনামুল কবির, ডা. এস এম মাসুদুর রহমান লিমন, অধ্যাপক ডা. এইচ এম কামরুজ্জামান, ডা. প্রদীপ দেবনাথ, ডা. হুমায়রা মুসলিমা বাবলী, অধ্যাপক ডা. মো. আবু সাঈদ, ডা. শহিদুজ্জামান বাবলু প্রমুখ।
খুলনার প্রবীণ চিকিৎসক ও বিএনপিপন্থী চিকিৎসক সংগঠন ড্যাবের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. রফিকুল হক বাবলুকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ও ক্ষোভ প্রকাশ করে কর্মসূচি দিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বিএমএ খুলনা জেলা কমিটি এবং বিএনপি সমর্থিত ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ড্যাব খুলনা জেলা ও বিভাগীয় কমিটি।
গত বুধবার খুলনা মহানগর ড্যাবের সভাপতি ডা. মোস্তফা কামাল, কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. এস এম আকরামুজ্জামান, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. এনামুল হক ও বিভাগীয় কমিটির সদস্য ডা. স ম গোলাম আজম স্বাক্ষর করা এক প্রতিবাদ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তৎকালীন অর্ন্তবর্তী সরকার একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে, যার চেয়ারম্যান করা হয় ডা. রফিকুল হক বাবলুকে। তিনি সততা, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে হাসপাতালের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সংসদ সদস্যের সামনেই খানজাহান আলী থানা বিএনপি সাবেক সভাপতি মীর কায়েসেদ আলী, সাবেক সহ-সভাপতি শেখ ইকবাল হোসেন, বর্তমান সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোল্লা সোহাগ হোসেনহ আরও কয়েকজন ডা. বাবলুকে যেভাবে অপদস্থ করেছেন, যা আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। সেখানে একটি চলমান ট্রাস্টি বোর্ডকে কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এইভাবে হুটহাট করে ভাঙা আইন সম্মত নয়। চলমান কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি করার জন্য যে বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়া প্রয়োজন সে বিষয়ে আলোচনার জন্য বারবার অনুরোধ করার পরেও কোন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।’
পৃথক বিবৃতিতে বিএমএর খুলনা জেলা সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে প্রবীন ও জনপ্রিয় চিকিৎসক নেতার সঙ্গে অশোভন আচরণের ঘটনায় খুলনার চিকিৎসকদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লিখিত ঘটনায় মব সৃষ্টিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
ড্যাব খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি ডা. মোস্তফা কামাল বলেন, বাবলু ভাইয়ের ঘটনায় শুধুমাত্র চিকিৎসক সমাজ নয়, আপামর পেশাজীবী সমাজ বিব্রত. ক্ষুব্ধ ও হতাশ। সুদীর্ঘ সময় পেশাজীবীরা রাজনীতিবীদদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলনে অবদান রেখেছি। তাকে বিদায় করতে চাইলে ভালো ভাবে কাজটা করা যেতো। তাকে উশৃঙ্খল রাজনীতির নির্মম বলি হতে হয়েছে। মারাত্মক অসম্মানজনক এ ঘটনার নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ জানাতে শনিবার আমরা মানববন্ধনে দাঁড়াবো।
জানতে চাইলে খানজাহান আলী থানা বিএনপির সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ট্রাস্টি বোর্ডের নামে এখানে জামায়াত পুনর্বাসন করা হয়েছে। তারা লুটপাটে লিপ্ত, সেবার মান সর্বনিম্ন। রোগীরা অপারেশন করতে এসে অন্ধ হয়ে বাড়ি ফেরে। অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলেনা। লবী ভাই আসবেন জানতে পেরে ক্ষতিগ্রস্ত রোগীরা হাজির হয়ে তাদের অভিযোগ জানায়। এ সময় চরম হইহট্টগোল সৃষ্টি হলে আমরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে লবী ভাই ট্রাস্টি বোর্ড ভেঙ্গে দিতে বাধ্য হন।
আলী আসগার লবী এমপি গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে জনগণ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছিলনা। বিশাল প্রতিষ্ঠান, কিন্ত অনিয়মে ভরা। আমরা ভালো লোক দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালাতে চাই। একে আর্ন্তজাতিক মানে উন্নীত করতে চাই। তার দাবি, ট্রাস্টিরা নিজেরা পদত্যাগ করেছেন। তাদেরকে কেউ অপসারণ করেনি। সবার সাথে কথা বলে যা করলে প্রতিষ্ঠানের ভালো হয়, সেভাবে কাজ করা হবে।