রাজবাড়ী সংবাদদাতা : গত ২৫ মার্চ বুধবার বিকাল সাড়ে ৫ টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ পরিবহনের একটি বাস রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় ফেরিতে উঠতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সর্বশেষ খবর অনুযায়ী নিহত হয়েছে ২৬ জন। গত রাত একটা পর্যন্ত ২৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত আরো তিন লাশ উদ্ধার হয়। উদ্ধার কাজে অংশ নেন ফায়ার সার্ভিস এবং মানিকগঞ্জ থেকে আসা ডুবুরি দল এবং উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। এ সময় বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলি নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি, রাজবাড়ী-২ আসনের এমপি হারুন অর রশিদ, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন সহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডাঃ শফিকুর রহমানের নির্দেশে রাজবাড়ী জেলা শাখার আমীর এ্যাডঃ মোঃ নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে জেলা সেক্রেটারি মোঃ আলীমুজ্জামান, রাজবাড়ী সদর উপজেলা আমীর অধ্যাপক মোঃ হেলাল উদ্দিন ও জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মোঃ শরীফ মিয়া সহ এক প্রতিনিধি দল সেখানে উপস্থিত থেকে উদ্ধার কাজ প্রত্যক্ষ করেন। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।

ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজবাড়ীকে আহবায়ক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার গোয়ালন্দ, রাজবাড়ীকে সদস্যসচিব করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি অন্যান্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক্রাইম এন্ড অপস, রাজবাড়ী। সহকারি মহাব্যবস্থাপক বিআইডব্লিউটিসি, দৌলতদিয়া ফেরিঘাট গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী। উপসহকারী পরিচালক ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স রাজবাড়ী। তদন্ত কমিটিকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে ঘটনার কারণ ও তার প্রতিকারে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। রাতে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে কিছু সময় উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ থাকলেও রাত বারটার পরপর বাস পানির উপরে তোলা হয়।

ইতিমধ্যে ২৫ লাশ তাদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। ১ জনের লাশ নেওয়ার জন্য তার স্বজনরা দিনাজপুর থেকে আসছেন। তারা এলে এ লাশ তাদের বুঝে দেওয়ার মাধ্যমে লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। গতকাল ঘটনার পরপর যারা বাস থেকে বের হয়ে সাঁতরে কূলে উঠেছিল তাদের মধ্যে একজন পথে অন্যজন হসপিটালে নেওয়ার পরে মারা যায়। আহত দুইজনের একজন এখন হসপিটালে ভর্তি অন্যজন প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করে বাড়িতে ফিরে গেছেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টার দিকে উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। নিখোঁজদের কোন তালিকা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য, রাজবাড়ী জেলা শাখার আমীর এ্যাডঃ মোঃ নুরুল ইসলাম এই মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হওয়ার খবরে শোক প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাস ডুবে যাওয়ার এই হৃদয়বিদারক সংবাদে আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও স্তব্ধ। এ পর্যন্ত ২৬ জন নিরীহ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যা আমাদের পুরো জেলাকে শোকাতুর করে তুলেছে। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যারা শাহাদাত বরণ করেছেন, মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাদের জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে এই কঠিন মুসিবত সহ্য করার ধৈর্য দান করেন। বিশেষ করে যারা তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাদের প্রতি রইলো আমার আন্তরিক সমবেদনা।

আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হোক এবং ঘাটে যাত্রী ও যানবাহন পারাপারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এভাবে তাদের প্রিয়জনকে হারাতে না হয়।

যারা উদ্ধারকাজে দিনরাত পরিশ্রম করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আসুন, আমরা দলমত নির্বিশেষে এই দুর্গত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াই এবং মহান আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দোয়া করি।

গতকালের বাস দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে: নিহতদের নাম ঠিকানা।

১) রেহেনা আক্তার(৬১), স্বামী- মৃত ইসমাঈল হোসেন খান, গ্রাম- ভবানীপুর, লালমিয়া সড়ক, রাজবাড়ী পৌরসভা, রাজবাড়ী। ২) মর্জিনা খাতুন(৫৬), স্বামী- মো: আবু বক্কর সিদ্দিক, গ্রাম- মজমপুর, ওয়ার্ড নং-১৮, কুষ্টিয়া পৌরসভা, কুষ্টিয়া। ৩) রাজীব বিশ্বাস(২৮), পিতা- হিমাংশু বিশ্বাস, গ্রাম+ডাকঘর - খাগড়বাড়ীয়া, থানা- কুষ্টিয়া সদর, কুষ্টিয়া। ৪) জহুরা অন্তি (২৭), পিতা- মৃত ডা: আবদুল আলীম, গ্রাম- সজ্জনকান্দা, ৫ নং ওয়ার্ড, রাজবাড়ী পৌরসভা। ৫) কাজী সাইফ (৩০), পিতা- কাজী মুকুল, গ্রাম- সজ্জনকান্দা, ৫ নং ওয়ার্ড, রাজবাড়ী পৌরসভা। ৬) মর্জিনা আক্তার (৩২), স্বামী- রেজাউল করিম, গ্রাম- চর বারকিপাড়া, ইউপি- ছোট ভাকলা, উপজেলা- গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী। ৭) ইস্রাফিল (৩), পিতা- দেলোয়ার হোসেন, গ্রাম- ধুশুন্দু, ইউপি- সমাজপুর, উপজেলা-খোকসা, কুষ্টিয়া। ৮) সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), পিতা-রেজাউল করিম, গ্রাম- চর বারকিপাড়া, ইউপি- ছোট ভাকলা, উপজেলা- গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী। ৯) ফাইজ শাহানূর (১১), পিতা- বিল্লাল হোসেন, গ্রাম- ভবানীপুর, ইউপি- বোয়ালিয়া, উপজেলা-কালুখালী, রাজবাড়ী। ১০) তাজবিদ(৭), পিতা- কেবিএম মুসাব্বির, ৫ং ওয়ার্ড, সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী পৌরসভা, রাজবাড়ী। ১১) আরমান খান(৩১), পিতা- আরব খান, পশ্চিম খালখোলা, উপজেলা- বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ী। (গাড়ির চালক) ১২) নাজমিরা জেসমিন (৩০), স্বামী- আব্দুল আজিজ, গ্রাম- বেলগাছি, ইউপি- মদেন্দ্রপুর, উপজেলা-কালুখালী, রাজবাড়ী। ১৩) লিমা আক্তার (২৬), পিতা- সোবাহান মন্ডল, গ্রাম-রামচন্দ্রপুর, ইউপি- মিজানপুর, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী।

১৪) জোস্ন্যা (৩৫), স্বামী- মান্নান মন্ডল, গ্রাম- বড় চর বেনি নগর, ইউপি- মিজানপুর, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী। ১৫) মুক্তা খানম(৩৮), স্বামী- মৃত জাহাঙ্গীর আলম, পিতা- সিদ্দিকুর রহমান, গ্রাম- নোয়াধা, ইউপি- আমতলী, উপজেলা-কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ। ১৬) নাছিমা (৪০), স্বামী- মৃত নূর ইসলাম,গ্রাম-মথুয়ারাই, ইউপি-পলাশবাড়ী, উপজেলা-পার্বতীপুর , দিনাজপুর। ১৭) আয়েশা আক্তার সুমা(৩০), স্বামী- মো: নুরুজ্জামান, গ্রাম- বাগধুনিয়া পালপাড়া, উপজেলা-আশুলিয়া, ঢাকা জেলা। ১৮) সোহা আক্তার (১১), পিতা- সোহেল মোল্লা, গ্রাম-রাজবাড়ী পৌরসভা, রাজবাড়ী। ১৯) আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), পিতা- গিয়াসউদ্দিন রিপন, গ্রাম+ইউপি-সমসপুর, উপজেলা-খোকসা, কুষ্টিয়া। ২০) আরমান(৭ মাস), পিতা- নুরুজ্জামান, গ্রাম- খন্দকবাড়িয়া, ইউপি-কাচেরকোল, উপজেলা-শৈলকুপা, ঝিনাইদহ। ২১) আব্দুর রহমান (৬), পিতা-আব্দুল আজিজ, গ্রাম- মহেন্দ্রপুর, ইউপি-রতনদিয়া, উপজেলা-কালুখালী, রাজবাড়ী। ২২) সাবিত হাসান (৮) পিতা- শরিফুল ইসলাম, গ্রাম- আগমারাই, ইউপি-দাদশি, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী। ২৩) আহনাফ তাহমিদ খান(২৫) পিতা-ইসমাইল হোসেন খান, গ্রাম-ভবানীপুর, ৮নং ওয়ার্ড, রাজবাড়ী সদর। ২৪) নাম :উজ্জ্বল পিতা :মজনু কালুখালী। ২৫) আশরাফুল পিতা- আফসার ম-ল, চর মদাপুর, কালুখালী, রাজবাড়ী। ২৬) জাহাঙ্গীর, পিতা- সানাউল্লাহ কালুখালী, রাজবাড়ী।