অগ্নিকাণ্ড যে কোনো কারণেই ঘটতে পারে। প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় অগ্নিকাণ্ডর ঘটনা ঘটে। কিন্তু রাজধানীর সবচেয়ে বড় ঘনবসতিপূর্ণ কড়াইল বস্তিতে বার বার কেন আগুন লাগে? বস্তিবাসীদের অভিযোগ-প্রতি বছরই কড়াইল বস্তিতে একাধিকবার আগুন লাগে। গত বছরও দুই বার আগুন লেগেছে এই বস্তিতে। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে-দুই হাজারেরও বেশি বস্তিঘর। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষের। সর্বশান্ত এসব মানুষের ঠিকানা এখন ফুটপাথে খোলা আকাশের নিচে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, গত ৫ বছরে দেশে আগুনের ঘটনা ঘটেছে, এক লাখ ২১ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে, হাজারখানেক আগুন দেয়া হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৭২০ জন। সামাজিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও অগ্নিসংযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনায় বাড়ছে আগুনের ঘটনা।

মহাখালী-বনানী-গুলশানের মতো বাণিজ্যিক-অভিজাত এলাকার মাঝখানেই প্রায় ৯০ একর এলাকা জুড়ে ঘনবসতিপূর্ণবস্তি কড়াইল। প্রায় লাখ খানেক মানুষের বসবাস এই বস্তিতে। এখানকার বাসিন্দাদের জীবিকা দিনমজুরি, ড্রাইভিং, ভাঙ্গারি ব্যবসা, গার্মেন্টস, রিকশা, ছোট ব্যবসা, ডে-লেবার, হকারি। কর্মজীবী নারী বাসিন্দাদের অধিকাংশরাই ছোট দোকানি, গার্মেন্টস ও বাসা-বাড়িতে কাজ করেন।

কিন্তু কড়াইল বস্তিতে বারবার আগুন লাগার কারণ কী? কে বা কারা দায়ী? আগুনের খবর পেয়েও কেন ফায়ার সার্ভিস বার বার আটকে যায় পথে? আগুনের নেপথ্যে কারও কোনো গোপন উদ্দেশ্যও কি অমূলক? সরকারেরই বা কী উদ্যোগ? সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না কখনোই। মোটাদাগে কারণগুলো উঠে আসে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের তদন্তে। কিন্তু তাতে আগুন লাগা বন্ধ হয়নি, নিঃস্ব হওয়া বাসিন্দারা কোমর সোজা করে দাঁড়াতেই আবারো নিঃস্ব হওয়ার করুণ পরিণতিও শেষ হচ্ছে না। যেখানে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় একজন মানুষের ন্যূনতম থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত প্রধান প্রায়োরিটি, সেখানে কড়াইল বস্তিতে গড়ে প্রতি ৪০-৫০ বর্গফুটে একজন মানুষ বসবাস শুধু মানবিক সংকটই নয়, অগ্নিকা-ের জন্যও যেন প্রস্তুত বারুদভা-ারের ন্যায়। তারই যেন প্রমাণ দিতে হয় প্রতিবছর আগুনে। কখনো কখনো বছরের ২/৩ বারও অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে কড়াইল বস্তিতে।

এদিকে পুড়ে যাওয়া কড়াইল বস্তিবাসীদের অভিযোগ-আগুন এখানে শুধু ঘরই পুড়ায়নি পুড়িয়ে দিয়েছে মানুষের বহু দিনের সঞ্চয়, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ। অস্থায়ী আশ্রয় মিললেও, বাস্তব প্রশ্ন রয়ে গেছে কবে মিলবে তাদের নতুন শুরু করার সুযোগ? অগ্নিকা-ের পর থেকে একে একে দেখতে আসছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। দিয়ে যাচ্ছেন সহযোগিতার আশ্বাস ও কথার ফুলঝুরি। তবে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি বস্তিবাসী।

বস্তির বাসিন্দারা জানান, বুধবার কড়াইল বস্তি দেখতে এসেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। রাজনৈতিক দল ও সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সহায়তা মেলেনি। সহায়তা বলতে তারা পেয়েছেন শুধু খাবার-পানি ও কিছু কাপড়চোপড়। তাদের দাবি-পূর্বের মতো ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হোক এবং তাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হোক। বস্তির বাসিন্দা শহিদুল ইসঠাম জানান, ২০ বছর ধরে এই বস্তিতে থাকছি। অন্য কোথাও থাকার জায়গা নেই। বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের নেতারা খাবার নিয়ে আসছেন, কিন্তু আর্থিক অনুদান পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা। তিনি আরও বলেন, আমার মতো অনেকের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কিছু একটা করে দিলে ভালো হতো, না হলে আমরা দিশেহারা হয়ে যাব। কড়াইল বস্তিতে ২৫ বছর ধরে বসবাস করছেন তানভীর হাসান। তাঁর একমাত্র সম্পদ ছিল একটি ছোট মুদি দোকান যা দিয়ে চারজনের সংসার চলত। অগ্নিকা-ে সেটিও পুড়ে এখন কেবল ছাই। তিনি বলেন, সরকার ও রাজনৈতিক নেতারা আশ্বাস দিচ্ছেন যে পাশে থাকবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদৌ পাশে পাব কি না সন্দেহ হচ্ছে। সবাই শুধু নাম লিখে যাচ্ছে, বলে যাচ্ছে সহযোগিতা করবে—কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ করেনি। কবে পাবো সহযোগিতা? ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দিলে অনেক উপকার হবে।

বস্তিবাসিরা বলেন, অগ্নিকা-ের পর বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শৌচাগারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে বাসিন্দাদের পাশাপাশি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশুরাও বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বাসিন্দারা বলছেন, অগ্নিকা-ের পর সকাল থেকে খাবার আসলেও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ তেমনভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি শৌচাগারের সংকটে পড়ছেন বাসিন্দারা। দুপুর সাড়ে ১২টার পর কয়েকটি সেবাদাতা এনজিও প্রতিষ্ঠান ছোট ছোট বোতলজাত পানি নিয়ে আসলেও সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। মুহূর্তেই বোতলজাত পানি শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান এনজিও কর্মীরা। পানির চাহিদা মেটাতে বোতলজাত পানির পাশাপাশি ওয়াসার বড় ট্যাংকারে করে পানি আনা হলেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এদিকে বিশুদ্ধ পানি না পাওয়ার পাশাপাশি শৌচাগারের সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দুস্থ ফাউন্ডেশনের একজন কর্মী জানান, আমরা প্রথমে দুটি বড় ট্যাংকারে করে পানি নিয়ে আসি। পরে দেখি পানিতে ময়লা রয়েছে। এরপর পানি পাল্টে ওয়াসা থেকে আবারও বিশুদ্ধ পানি আনা হয়েছে। কিন্তু পানি আনার পর নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, অগ্নিকা-ের পর খাবার নিয়ে আসলেও বিশুদ্ধ পানি তেমন কেউ দিচ্ছে না। আমাদের পর্যাপ্ত খাবার থাকলেও তার বিপরীতে পানি নেই। আমরা বিশুদ্ধ খাবার পানি চাই-বিশেষ করে শিশুদের জন্য। পাশাপাশি টয়লেটের সমস্যায় ভুগছি। স্বেচ্ছাসেবীরা ছোট বোতলে পানি আনলেও সবাই পাচ্ছে না। আমরা চাই দ্রুত বিশুদ্ধ খাবার পানি পৌঁছে দেওয়া হোক। আরেক বাসিন্দা সালেহা বেগম বলেন, বুধবার বিকেল থেকে আমাদের জন্য খিচুড়ি, তেহারি ও মুড়ি এসেছে। কিন্তু এসব খাবারের সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন। আমরা অনেকে বুধবার রাত থেকে পানি না খেয়ে আছি। পাশাপাশি টয়লেট সংকট ভয়াবহ। অগ্নিকা-ে সব টয়লেট পুড়ে গেছে। কোথাও যেতে পারছি না।