ভোলা ও চাঁদপুর জেলা সংবাদদাতা : শীতের ঘন কুয়াশায় দৃষ্টিসীমা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার মেঘনা নদীতে দুই যাত্রীবাহী লঞ্চের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটেছে। এতে এখন পর্যন্ত ৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন এবং অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার পর হাইমচরের হামিদচর এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ভোলার ঘোষেরহাট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা অভিমুখী যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি জাকির সম্রাট-৩ রাতের আঁধার ও ঘন কুয়াশার মধ্যে হাইমচর এলাকা অতিক্রম করছিল। এ সময় বিপরীত দিক থেকে ঢাকা থেকে বিএনপির সম্মেলনে অংশ নেওয়া যাত্রী বহনকারী বরিশালগামী এমভি অ্যাডভেঞ্চার ৯ লঞ্চটি দিক নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়ে সজোরে ধাক্কা দেয় জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চে।
যাত্রীরা অভিযোগ করেন, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার মধ্যেও অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। সংঘর্ষের ফলে জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে দুর্ঘটনার পরপরই অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
দুর্ঘটনার পর জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি মাঝনদীতে ডুবো-ডুবো অবস্থায় ভাসতে থাকলে ভোলা থেকে ঢাকাগামী আরেকটি লঞ্চ এমভি কর্ণফুলী-৯ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অনেক যাত্রীকে উদ্ধার করে ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে যায়।
এদিকে উদ্ধার হওয়া নিহতদের মরদেহ ও গুরুতর আহত যাত্রীদের নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি চিকিৎসার জন্য চাঁদপুরের দিকে রওনা দেয়।
চাঁদপুরের হাইমচর থানাধীন মেঘনা নদী এলাকা থেকে এ পর্যন্ত ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের সবাই ভোলা জেলার বাসিন্দা। নিহতরা হলেন
১) আব্দুল গনি (৩৮), পিতা: সেরাজুল বেপারী, সাং কাজিরাবাদ, লালমোহন, ভোলা।
২) মোঃ সাজু (৪৫), পিতা: মৃত কালুখা, সাং কাজিরাবাদ, লালমোহন, ভোলা।
৩) হানিফ (৬০), পিতা: আমির হোসেন, সাং আহম্মদপুর দুলারহাট, চরফ্যাশন, ভোলা।
৪) মোছাঃ রিনা (৩৫), পিতা: মৃত মোক্তার হোসেন, স্বামী: মিলন, সাং কচুখালি গজারিয়া, লালমোহন, ভোলা।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্থানীয় প্রশাসন ও নৌ-পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আমাদের চাঁদপুর জেলা সংবাদদাতা জানান, পরবর্তীতে গতকাল শুক্রবার সকাল আনুমানিক ৯টা ৪৫ মিনিটে এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি ঢাকা সদরঘাট নৌ টার্মিনালে পৌঁছালে সদরঘাট নৌ থানার পুলিশ নিহতদের লাশ উদ্ধার করে এবং আহতদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
অন্যদিকে এমভি এডভেঞ্জার-৯ লঞ্চটি সকাল আনুমানিক ৯টা ১৫ মিনিটে ঝালকাঠি নৌঘাটে পৌঁছানোর পর লঞ্চটির ৪ জন স্টাফকে আটক করা হয়। ঘটনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নৌপথে চলাচলের সময় ঘনকুয়াশায় সকল নৌযানকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার: চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সদরঘাটে ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, সব ধরনের পরিবহনের মধ্যে নদীপথ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তারপরও এ ধরনের দুর্ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। আমি নিজেও নিয়মিত নদীপথে যাতায়াত করি। লক্ষ্য করেছি, অনেক সময় রাতে লঞ্চ চলাচলের ক্ষেত্রে লাইট ব্যবহার করা হয় না। তিনি জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই লঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্তদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তিনি আরো জানান, এরই মধ্যে কয়েকটি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাতে কুয়াশার মধ্যে কোনো লঞ্চ চলাচল করতে পারবে না। রাতে কোথাও দাঁড়ালে অবশ্যই লাইট ব্যবহার করতে হবে। এ মৌসুমে বাল্কহেড সকাল ৮টার আগে চলাচল করতে পারবে না। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করা হবে।
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঝড় বা তুফানে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু যেভাবে দুটি লঞ্চের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, তাতে মনে হয় চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন অথবা অন্য কাউকে দিয়ে লঞ্চ চালাচ্ছিলেন। তবে তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো লঞ্চচালক সঠিকভাবে লঞ্চ পরিচালনা না করলে, রাতে লাইট ব্যবহার না করলে বা নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিল করা হবে।