* শতাধিক যাত্রী আহত

*পাঁচ জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

* দুর্ঘটনা তদন্তে কমিটি

বগুড়া অফিস ও আদমদীঘি সংবাদদাতা

ঢাকা থেকে চিলাহাটি যাওয়ার পথে বগুড়ার সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এসময় ট্রেনের ছাদে থাকা শতাধিক যাত্রী নিচে ছিটকে পড়ে আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম স্টেশনের দক্ষিণে ব্রিজের সামনে বুধবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে এ দূর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনটি ঢাকা থেকে চিলাহাটির দিকে যাচ্ছিল। সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশনে জুনিয়র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হাবিবুর রহমান বলেন, লাইনে কাজ চলছিল তবে ট্রেনের ইঞ্জিনে অতিরিক্ত যাত্রী থাকার কারণে লাল পতাকা দেখতে না পেয়ে ট্রেন চালক চালিয়ে যাওয়ার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

সান্তাহার রেলওয়ে থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজুর রহমান বলেন, “নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছেড়ে এসে বেলা ২টার দিকে সান্তাহার স্টেশনে বিরতি করে। এরপর সান্তাহার স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার কিছু সময় পরেই ছাতিয়ান গ্রামে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। এতে ট্রেনটির ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়নি। ট্রেনের ছাদে অনেক মানুষ থাকায় ছাদ থেকে পড়ে অনেকে আহত হয়েছেন। বগিগুলো উদ্ধারের জন্য কাজ চলছে”। তিনি আরো জানান, লাইন মেরামত কাজ চলমান থাকায় লাল পতাকা উড়ানো হয়। কিন্তু ট্রেনের চালক লাল পতাকা খেয়াল না করে ট্রেন চালিয়ে গেলে এ দূর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হ্সাপাতাল ও নওগা জেলা হাসপাতালে বেশ কয়েকজনকে ভর্তি করা হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

এদিকে, দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে উৎসুক জনতা ভীড় করতে থাকে। মানুষের ভিড়ের কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আদমদীঘি থানার ওসি আতাউর রহমান জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন। এখনো কারো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

‘ট্রেনটা হঠাৎ করে কেঁপে উঠলো। তারপরই দেখি মানুষ চিৎকার করছে। কয়েকটা বগি কাত হয়ে গেছে। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছিল।’

এভাবেই নিজের আতঙ্কের কথা জানান দুর্ঘটনার শিকার নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী আমিনুল ইসলাম। ৯ বগি লাইনচ্যুতের ঘটনায় শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে সান্তাহার জংশনের কাছাকাছি ছাতনীগ্রামের বাগবাড়ি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সাময়িকভাবে উত্তরাঞ্চলের অন্তত পাঁচ জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ বিকট শব্দে ট্রেনটি দুলতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পাশের জমিতে ছিটকে পড়ে।

দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করেন।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৪৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মোট আহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। অনেকে নিজেরাই নিকটবর্তী হাসপাতালে চলে যান।

নওগাঁ সদর হাসপাতাল, আদমদীঘী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে আহতদের ভর্তি করা হয়েছে। নওগাঁ সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অন্তত ৮০ জন চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। যাদের মধ্যে অন্তত ২০ জনকে ভর্তি করতে হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

পাঁচ জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

দুর্ঘটনার ফলে উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ রেলরুটটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাট জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

মিনহাজ নামের একজন যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঈদের সময়ই যদি এমন হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাবো? টিকিট কেটে এত দূর এসে আটকে গেলাম।’

দুর্ঘটনা তদন্তে কমিটি

বগুড়ার সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুতির ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী আন্তঃনগর ট্রেনটি দ্রুতগতিতে আসছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে কয়েকটি বগি লাইন থেকে ছিটকে পড়ে। মুহূর্তেই যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে চিৎকার করতে থাকেন। দুর্ঘটনার সময় ট্রেনের ছাদেও বিপুলসংখ্যক যাত্রী ছিলেন।

আহতদের উদ্ধারে কাজ শুরু করেছেন স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তাদের আদমদীঘি ও নওগাঁ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর থেকে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্টেশনে একাধিক ট্রেন আটকা পড়েছে। এতে ঈদযাত্রায় বাড়ি ফেরা যাত্রীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সান্তাহার ও ঈশ্বরদী থেকে উদ্ধারকারী রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। দ্রুত লাইন পরিষ্কার করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।