কুমিল্লায় ট্রেনের ধাক্কায় একটি যাত্রীবাহী বাসের ১২ যাত্রী নিহত হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে আরও অন্তত ৫ যাত্রী। নিহতদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ৩ নারী ও ২ শিশু রয়েছে।
শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লা পদুয়ার বাজার রেল ক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
এ সময় খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা উদ্ধার কাজ চালান।
ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ৩টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ওয়ান আপ ট্রেন কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড অতিক্রমকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীগামী মামুন স্পেশাল নামে একটি যাত্রীবাহী বাস ওই লেভেল ক্রসিং পার হচ্ছিল। সে সময় চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে বাসটির ধাক্কায় ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে বাসটি আটকে যায়। এরপর ইঞ্জিনের সঙ্গে বাসটি আটকে থাকায় ট্রেনটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে এসে দাঁড়িয়ে যায়। এতে করে বাসটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়ায় যাত্রীরা গুরুতর আহত হয়।
এ সময় ট্রেন যাত্রীদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে আহতদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে পাঠান।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ঘটনাস্থল থেকে তারা তিন জনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে কুমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরে আজ সকাল ৭টা ১৮ মিনিট থেকে চট্টগ্রামমুখী লাইনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ সময় চট্টগ্রাম অভিমুখী চট্টগ্রাম মেইল কুমিল্লা স্টেশন ছেড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসক রেজা হাসান ও হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
তদন্তে ৩ কমিটি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় বাস ও ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের ঘটনায় রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে কর্তব্যে অবহেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট রেললাইনের দুই গেটম্যানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত পৌনে ৩টার দিকে পদুয়া বাজার বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচের রেল ক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী 'ঢাকা মেইল' ট্রেনের সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী 'মামুন স্পেশাল' পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (চট্টগ্রাম) আনিসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের একটি কমিটি এবং জোনাল পর্যায়ে চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে আরও একটি ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
এছাড়া দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে গেটম্যান মেহেদী হাসান ও মো. হেলাল উদ্দিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনায় আহতদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৫ জন সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ১৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পরপরই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার কাজ শুরু করে। ইতোমধ্যে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি লাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম সিদ্দিকী জানান, দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হলেও বর্তমানে ডাউন লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে কুমিল্লা স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ট্রেন ছেড়ে গেছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন চলাচল এখন স্বাভাবিক রয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর শোনার পরপরই জেলা প্রশাসক, হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার এবং রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।