ঈদের ছুটির মধ্যে ফাঁকা সড়কে ছয় জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এ সব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জনের মত। শনিবার গভীর রাত থেকে রোববার বিকাল পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে। গভীর রাতে সেখানে ট্রেন ও বাসের মধ্যে সংঘর্ষে ১২ জনের প্রাণ গেছে। এ ছাড়া সকালে হবিগঞ্জে পিকআপ ভ্যান খাদে পড়ে নারীসহ চারজনের প্রাণ গেছে। ফেনী সদর উপজেলায় বাস-অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মধ্যে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছে। কিশোরগঞ্জে নিহত হয়েছেন দুজন।

কুমিল্লা : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আটজন। শনিবার রাত ৩টার আগে আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ারবাজার লেভেল ক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটি ক্রসিং পার হওয়ার সময় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস রেললাইনে উঠে পড়লে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটিকে ছেঁচড়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায় ট্রেন। নিহতরা হলেন-চাঁদপুর জেলার চাপাতলি এলাকার মমিনুল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম (৬৭), ঝিনাইদহের মোক্তার বিশ্বাসের ছেলে জুহাদ বিশ্বাস (২৪), যশোরের চৌগাছার সিরাজুল ইসলাম (৭০) ও তার স্ত্রী কোহিনূর বেগম (৫৫), নোয়াখালী সোনাইমুড়ি বাবুল চৌধুরী (৫৫), মাগুরার মোহাম্মদপুর এলাকার ওহাব শেখের ছেলে ফচিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার জীবন নগরের বিল্লাল হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (২৫), নোয়াখালীর ফাজিলপুরের মো. সেলিমের ছেলে নজরুল ইসলাম রায়হান (৪৫) ও লক্ষ্মীপুর সদরের সিরাজুল ইসলামের মেয়ে সাঈদা (৯), যশোরের গাড়ি চালক পিন্টু ইসলামের স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬), দুই মেয়ে খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৩)।

হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় পিকআপ ভ্যান খাদে পড়ে নারীসহ চারজনের প্রাণ গেছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আন্দিউড়া এলাকায় রোববার সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে শায়েস্তাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি শুভ রঞ্জন চাকমা জানিয়েছেন। নিহতরা হলেন- পিকআপ ভ্যানের চালক ইব্রাহিম, আসমা আক্তার (৪০) ও তার ছেলে সজিব (১৩)।

ফেনী : ফেনীর সদর উপজেলায় বাস-অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও চারজন। রোববার ভোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার রামপুর ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন মহিপাল হাইওয়ে থানার ওসি আসাদুল ইসলাম। নিহত তিনজনের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। তাদের একজন, ঢাকার বাংলামোটর এলাকার মুস্তাফিজুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ মোরশেদ (৩৯) ও লালবাগ এলাকার সোহাগ (৩৮)।

নওগাঁ : নওগাঁর রাণীনগরে ঈদের দিন বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে ভটভটি উল্টে পুকুরে পড়ে এক কিশোর মারা গেছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত পাঁচজন। শনিবার রাত পৌনে ৯টায় দিকে ভাটকৈ-দেউলা রাস্তার ভাটকৈ খগেনের পুকুরপাড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে রাণীনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বাবলু পাল জানান। নিহত ১২ বছর বয়সী মো. হৃদয় রানীনগর উপজেলার আমিরপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে বলে জানা গেছে।

নাটোর : নাটোরের বড়াইগ্রামে প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা খেয়ে একজন নিহত হয়েছেন।

রোববার সকাল ৮টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের গড়মাটি কলোনি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে বনপাড়া হাইওয়ে থানার ওসি, মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন। নিহত ২৯ বছর বয়সী জুলফিকার আলী জিল্লু পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া নওদাপাড়া এলাকার আনছারুলের ছেলে।

কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলায় পিকআপ চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধুর প্রাণ গেছে; এতে আহত হয়েছে আরও এক বন্ধু।

রোববার বিকালে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে উপজেলার ছয়সূতি ইউনিয়নের দাড়িয়াকান্দি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানান ভৈরব হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সুমন কুমার চৌধুরী।

‎নিহতরা হলেন- উপজেলার দরিয়াকান্দি এলাকার বিজয় (১৮) ও তার বন্ধু জাবির হোসেন (১৮)।

পুলিশ জানায়, বিকালে মোটরসাইকেলে তিন বন্ধু ঘুরতে বের হন। পথে বিপরীত দিক থেকে আসা মুরগি বোঝাই একটি পিকআপ ভ্যান মোটরসাইকেলটিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই বিজয় ও জাবির নিহত হন। আহত অপর আরোহীকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দুই রেল কর্মীকে আসামী করে মামলা

‎‎কুমিল্লা অফিস :

‎কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ১২ জন যাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শেফালী আক্তার (৫৮) নামের এক নারী কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে থানায় বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

‎‎এতে রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী মো. হেলাল ও মেহেদী হাসানকে আসামী করা হয়েছে। এ ছাড়া রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামী করা হয়েছে। গত শনিবার গভীর রাতের ওই ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ওই দুজনকে বরখাস্ত করেছিল রেলওয়ে বিভাগ।

‎মামলায় বাদী শেফালী আক্তার নিজেকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার রায়পুর গ্রামের সোহেল রানার (৪৬) খালা বলে উল্লেখ করেছেন। সোহেল রানা দুর্ঘটনায় নিহত ১২ জনের একজন। শেফালী আক্তার লাকসাম উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের মরহুম আক্তারুজ্জামানের স্ত্রী।

‎‎ঈদের দিন শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেন। এতে প্রাণ হারান ৭ জন পুরুষ, ২ নারী, ৩ শিশুসহ ১২ জন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন অন্তত ১০ জন। হতাহত ব্যক্তিরা ছিলেন বাসের যাত্রী।

‎ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত গেটম্যানের দায়িত্বহীনতায় এ ঘটনা ঘটেছে। ওই ক্রসিংয়ে দায়িত্বরত দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তিনটি তদন্ত কমিটি।

‎এদিকে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে গেটম্যান হিসেবে দুজনকে বরখাস্ত করা হলেও মামলায় একজনকে অস্থায়ী গেটম্যান এবং আরেকজনকে ওয়েম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎‎মামলার প্রধান আসামী মো. হেলাল (৪১) কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে। তিনি পদুয়া বাজারের রেলওয়ে ওভারপাসের নিচে থাকা রেলগেট নম্বর ই/৪৭-এর অস্থায়ী গেটম্যান হিসেবে কর্মরত। অন্য আসাীম মেহেদী হাসান (৩৩) বুড়িচং উপজেলার বাহিরীপাড়া এলাকার আবদুল কাদেরের ছেলে। তিনি ওই লেভেল ক্রসিংয়ে ওয়েম্যান হিসেবে কর্মরত। এ ‎বিষয়ে জানতে মো. হেলাল ও মেহেদী হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে তাঁরা আত্মগোপনে আছেন।

বাদী শেফালী আক্তার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, নিহত সোহেল রানা তাঁর বোনের ছেলে। তিনি মালয়েশিয়াপ্রবাসী। গত ১৫ রমযানে প্রবাস থেকে বাংলাদেশে ছুটিতে আসেন। ঈদের দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটের দিকে ঝিনাইদহের খালিশপুর বাস কাউন্টার থেকে মামুন স্পেশাল পরিবহনের বাসে করে সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী–সন্তান লাকসামে বেড়াতে রওনা দেন। গতশনিবার রাত তিনটার একটু আগে বাসটি পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে আসে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ঢাকা মেইল ওয়ান আপ ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে ধাক্কা লাগার কারণে বাসটি ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। এ সময় ইঞ্জিন বাসটি টেনেহিঁচড়ে প্রায় এক কিলোমিটার নিয়ে যায়।

‎লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসীম উদ্দিন খন্দকার বলেন, পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংকে ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ওই লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী হেলাল ও মেহেদী হাসানকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তাঁরা পলাতক। তাঁদের ধরার চেষ্টা করছে পুলিশ। পুলিশও ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।

‎‎১২ লাশ বাড়ি পৌঁছে দিল জামায়াত

‎কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে নিহত ১২টি লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে নিজ নিজ বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুমিল্লা মহানগরী।একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহনের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে। ‎দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগরীর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ এবং মহানগরীর সেক্রেটারী মাহবুবর রহমান,সহকারী সেক্রেটারি কামরুজ্জামান সোহেল ।

‎জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম বলেন, দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিক দায়িত্ব। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শোকাহত পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। ‎কুমিল্লা মহানগরীর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে রেল ক্রসিংয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।

‎‎এ সময় নেতৃবৃন্দ আহতদের উন্নত ও সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণে হাসপাতাল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেন। পাশাপাশি চিকিৎসা কার্যক্রম তদারকির জন্য ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের একটি টিম সার্বক্ষণিক সমন্বয় করছে বলে জানা যায়। তিনি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

চট্টগ্রামে নানা ঘটনায় ১৬ প্রাণহানি

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে মাত্র পাঁচ দিনে (১৯ থেকে ২৩ মার্চ) পৃথক দুর্ঘটনা, অগ্নিকা-, হত্যাকা- ও আত্মহত্যাসহ নানা ঘটনায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে নগরের টেরিবাজার এলাকায়। কে বি অর্কিড প্লাজা নামের একটি মার্কেটের চতুর্থ তলায় অগ্নিকা-ে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মোহাম্মদ ইউনুস (৫২) ও সোলাইমান (২৮) নামে দুইজনের মৃত্যু হয়। ১৯ মার্চ সকালে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

একই দিনে মিরসরাইয়ের নাপিত্তাছড়া ঝরনার কূপ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়দের খবরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) মর্গে পাঠানো হয়।

এদিকে ফটিকছড়িতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে মুহাম্মদ আলী মর্তুজা (২২) নামের এক যুবকের আত্মহত্যার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। তিনি নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

পরদিন ২০ মার্চ কর্ণফুলী নদীর নতুন ব্রিজ এলাকায় একটি বালুবাহী ড্রেজারের সঙ্গে আটকে থাকা শাহরিয়ার ফাহাদ (২১) নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকদিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে।

একই দিন সীতাকু-ে পারিবারিক বিরোধের জেরে মো. রাজু (৩০) নামে এক যুবককে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ। একই রাতে সাতকানিয়ায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত মিজানুর রহমান (২৬) পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২১ মার্চ পটিয়ায় বাস উল্টে আবুল কাশেম (৬৫) ও সোলায়মান (৪০) নিহত হন এবং অন্তত ১০ জন আহত হন। একই দিন মিরসরাইয়ে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা লেগে চালক এনামুল হক আইয়ুব (৪০) নিহত হন। এছাড়া লোহাগাড়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ইশফাত (২২) নামে এক যুবক নিহত হন এবং অপর একজন আহত হন।

২২ মার্চ হাটহাজারীতে বিয়ের মাত্র দেড় মাসের মাথায় নববধূ ঝুমা আক্তার (১৯)-এর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, পরকীয়া সম্পর্কের জেরে স্বামীর নির্যাতনে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিন সীতাকু-ে একটি নালা থেকে নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, রাতের আঁধারে কেউ লাশটি ফেলে গেছে।

বাঁশখালীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় জনি শীল (৪) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। অপরদিকে নগরের বাকলিয়ায় মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে কাতারপ্রবাসী সোলেমান (৩৫) নিহত হন।

সর্বশেষ ২৩ মার্চ সীতাকু-ে কাভার্ডভ্যানে ধাক্কা লেগে মোটরসাইকেল আরোহী আবু বক্কর (২৫) নিহত হন। তিনি বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অধিকাংশ ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে স্বল্প সময়ে এতগুলো প্রাণহানির ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা কমানো সম্ভব।

যশোরে সড়কে ঝরল তিন প্রাণ

যশোর সংবাদদাতা : যশোরের বাঘারপাড়ায় এক হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও তিনজন, যাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। একসঙ্গে বাবা, ছেলে ও নাতনির মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

ঘটনাটি ঘটে সোমবার (২৩ মার্চ) দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে। যশোর-মাগুরা মহাসড়কের বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা ইউনিয়নের গাইদঘাট বাজার এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।

নিহতরা হলেন মণিরামপুর উপজেলার ফাতেহাবাদ গ্রামের বাসিন্দা মজিদ সরদার (৭০), তার ছেলে মাহমুদ হাসান জাকারিয়া জনি (৪৩) এবং জনির চার বছরের কন্যা সেহেরিশ। একই পরিবারের আরও তিন সদস্য গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহতরা আত্মীয়ের বাড়ি থেকে একটি প্রাইভেট কারে করে নিজ বাড়ি মণিরামপুরে ফিরছিলেন। গভীর রাতে গাইদঘাট বাজার এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ করেই গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এরপর সজোরে রাস্তার পাশে একটি বড় বটগাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার কাজ শুরু করেন। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং নিহতদের লাশ যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঝিনাইদহের বারোবাজার হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদ হোসেন জানান, দুর্ঘটনার পরপরই লাশগুলো উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একটি পরিবারে নেমে এসেছে অকাল শোকের ছায়া। বিশেষ করে চার বছরের নিষ্পাপ শিশুর এমন করুণ মৃত্যু এলাকাবাসীকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।