ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জসিম উদ্দিন খান। জুলাই আন্দোলন ২০২৪ইং তিনি পুলিশের গুলিতে একটি চোখ হারিয়েছেন। তার শরীর থেকে বের করা যায়নি বহু সংখ্যক গুলির প্লিন্টার। এতসব যন্ত্রণার পরও দেশ থেকে ফ্যাসিজমকে বিদায় করতে পেরে সন্তুষ্ট তিনি। ডাকসু অফিসে বসে জুলাইয়ের দেনা পাওনা নিয়ে দৈনিক সংগ্রামের সাথে কথা বলেছেন তিনি।
ডাকসু জুলাইকে কি দিলো আর জুলাই ডাকসু থেকে কি পেলো এমন প্রশ্নে ডাকসু নেতা জাসিম উদ্দিন খান জানান, ডাকসু এসেছে জুলাইয়ের পর। জুলাই না এলে আমরা এরকম ডাকসু কখনোই পেতাম না। সারাদেশের মানুষের মুক্তি, বর্তমান সরকার, ডাকসু নির্বাচন, দেশের স্থিতিশীল অববস্থা, আসলে ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা পুরোটাই জুলাইয়ের অবদান। তারই অংশ হিসেবে বর্তমান ডাকসু। আসলে ডাকসু জুলাইকে কি দিতে পেরেছে ব্যাপারটা এরকম না। আসলে জুলাই আমাদের জাতীয় জীবনের ঐতিহাসিক একটা ইভেন্ট; যেটা পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পট পরিবর্তন করে দিয়েেেছ। সেই জায়গা থেকে জুলাইকে দেওয়ার মতো কিছু নাই। আমরা যেটা পারি সেটা হলো জুলাইয়ে শহীদ,জুলাইয়ে আহতদের জন্য কিছু করতে পারা। একইসাথে যে ্আকাংখা নিয়ে জুলাই ঘটলো, সেই আকাংখাকে বাস্তবায়ন করা। সেটা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা মানুষের স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারাটাই হলো জুলাইকে কিছু দেওয়া। আমাদের উচিত জুলাই শহীদদের ত্যাগ এবং তাদের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করার যে স্বপ্ন ছিল সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পারাটাই হলো জুলাইকে কিছু দেওয়া। এর অর্থ হলো জুলাই শহীদদের ত্যাগকে মূল্যায়ন করা। এরবাইরে যদি আমরা বলি, সাংস্কতিকভাবে জুলাইকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা, বা রাখা সেই ক্ষেত্রে ডাকসু বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এবছর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক জুলাই কনফারেন্সেরে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ডাকসুর উদ্যেগে। আমাদের প্রত্যাশা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সবশ্রেণি পেশার মানুষ, সংগঠন, সংস্থা জুলাইকে উদযাপন করবে। আরেকটা কথা হলো জুলাইকে সেলিব্রেসনে আটকে না রেখে জুলাইকে সামনে রেখে, ধারণ করে দেশের জন্য সার্বিকভাবে কিছু করতে পারলেই জুলাইকে কিছু দেওয়া হবে। জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে আর কতটুকু বাকী আছে এরকম প্রশ্নে জুলাই যুদ্ধের সামনের সারির যোদ্ধা এবং ডাকসু নেতা জসিম উদ্দীন খান বলেন, জুলাইয়ের আকাংখা এতটুকু আর দেনা-পাওনা এতটুকু এভাবে না বলে যদি এভাবে বলি আমরা ছাত্র-জনতা মিলেই জুলাই এনেছি। আমরা একটা স্বপ্নের বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য আমরা জীবন দিয়েছি। স্বপ্নের বাংলাদেশটা এক দুই দিনে নির্মাণ করা সম্ভব না। কিছু কিছু স্বপ্নের শেষ থাকে না। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত না হবে, বিশে^ নেতৃত্ব দেওয়ার মতো দেশে পরিণত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জুলাইয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে না বলে আমি মনে করি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের সরকারের প্রতি একটা ক্ষোভ আছে, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না। বলতে গেলে তারা সরে এসেছে। আমার দাবি থাকবে সরকারের কাছে, ৭০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে। সরকার যেন অতিদ্রুত তা বাস্তবায়ন করে। জুলাই এবং ডাকসুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটুকু নিয়ে যেতে পেরেছেন, এমন প্রশ্নে জবাবে ডাকসু নেতা বলেন, আমরা চায়না সরকারের আমন্ত্রণে চীন ভিজিট করেছি। বিভিন্ন দূতাবাসের প্রতিনিধিরা ডাকসুতে আসছেন। যতটুকু সম্পর্ক স্থাপন করা যায় করছি। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। আমরা ভাল কিছুর প্রত্যাশায় আছি।
ডাকসুকে প্রশাসন সহযোগিতা করছে না জানিয়ে এই ছাত্র নেতা বলেন আমরা ডাকসুকে সফল করা কিংবা সার্বজনীন করা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যানে কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আপনি দেখবেন ২০২৬ সালের ২৭ জুন পর্যন্ত বাজেট এক লাখ টাকা দিয়েছে। এই টাকা দিয়েতো কোন প্রোগ্রাম করা যায় না। এর মধ্যেও আমরা শিক্ষার্থীবান্ধব প্রোগ্রাম করছি। সবগুলোতে আমরা সফল হয়েছি আল্লাহর রহমতে। এক্ষেত্রে স্পন্সরশীপ এনে এগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশাসনের উচিত ছিল আমাদের একটি ভাল বাজেট দেওয়া। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা বিভিন্ন অংশীজনের সাথে যোগাযোগ করে চেষ্টা করছি কিছু করার।
জুলাইয়ের স্মৃতি কাতরাতে গিয়ে তিনি জানান, ১৮জুলাই যেদিন আহত হই সেটি আমার সব সময় চোখে ভাসে। আমরা চারজন সামনে ছিলাম। পুলিশ গুলি করছিল। আমাকে পুলিশ টার্গেট করে গুলি করে। আমার চোখে গুলি লাগে। প্রথমে মনে হয়েছে শুধু আমার চোখে লেগেছে। চোখ ধরে যখন বসে পড়ি তখন ঘুরতে গিয়ে পড়ে গেছি। তখন আমাকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রিকশা থেকে যখন নামনো হলো তখন টের পেলাম সারা শরীর থেকে ব্রেডিং হয়েছে অনেক। আমি দাড়ানোর শক্তি পাচ্ছি না। মজার বিষয় হলো আমি নিজে ভোজন রসিক মানুষ। একবেলা না খাওয়া আমার সহ্য হয় না। অথচ সেইদিন (১৮ জুলাই ২০২৪) সকালে নাস্তা খেতে পারিনি। দুপুরে খাওয়ার সময় পাইনি আন্দোলনের জন্য। আবার গুলি লাগে বিকাল ৫টার পর। মানে সারদিন আমি না খাওয়া। এরপর হালকা কিছু খেতে পেরেছিলাম রাত ১২টার পর। সারাদিন না খাওয়ার পরও শরীরে গুলি লাগা। এরপরও আমি জ্ঞান হারাইনি। আমি মনে করি সেটা আমি কিংবা আমরা আন্দোলনকারীদের আল্লাহ ঐশ^রিকভাবে সাহায্য করেছেন। শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, বাম চোখে একদম দেখি না সম্ভবনাও নাই। দুইটা অপারেশন হয়েছে। এরপর ডাক্তাররা বলে দিয়েছেন আর দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে না। আমার বাম চোখ এভাবেই আছে ঠিক হওয়ার কোন সম্ভবনা নাই। আর আমার শরীরে ছররা গুলি লেগেছিল ৮৬টা। এরমধ্যে ১২টা বের করা গেছে। বাকী ৭৪টা রয়ে গেছে।