আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতিক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় তুঙ্গে পুরো দেশ। নির্বাচনে অংশ নেয়া সব দলই সভা-সেমিনারে নিজেদের অঙ্গিকার গুলো তুলে ধরছেন। বিভিন্ন সংগঠন নির্বাচন নিয়ে তাদের জরিপ প্রচার করছে। তবে রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, যে যা-ই বলুক না কেন, এখন ভোটাররা অনেক বেশি সচেতন। তাদেরকে ভুল, মিথ্যা বা চমকদার আশ্বাস দিয়ে টলানো যাবে না। তারা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দে প্রধান্য পাবে দুর্নীতিমুক্ত ও চাঁদাবাজ মুক্ত দেশ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাংবিধানিক সংস্কার, জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও অবদানই বেশি প্রাধান্য পাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলগুলোর ভূমিকা আগামী নির্বাচনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। সংস্কার কর্মসূচি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। আশ্বাস নয়, জনআকাক্সক্ষা পূরণে সক্ষম দলগুলোই ভোটারদের প্রধান পছন্দের তালিকায় থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই অভূত্থানের পরে দেশবাসী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পজেটিভ আচরণ প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ দলই সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। যারা নিজেদের ভবিষ্যত সরকারে যাবে বলে প্রচার করছে, তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সুরেই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এমন হীন কোনো কর্মকান্ড নেই, যা তারা করছে না। প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতাদের হেনস্থা করতে তাদের নামে মিথ্যা অপবাদ পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব অপবাদ ফলাও করে নিজেরাই প্রচার করছে। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে যারা নতুন ধারার রাজনীতি করতে ব্যর্থ হয়েছে, জনগণ তাদের এবারের নির্বাচনে বয়কট করবে। একইসাথে যারা জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থেকেছে, তাদেরও ভোটদান থেকে বিরত থাকবে।

ভোটারদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে যেসব দল জুলাই ঘোষণা বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রের আমূল সংস্কারের পক্ষে কথা বলছে, তারাই ভোটের রাজনিিততে জনসমর্থন পাবে। যেসব দলের নেতারা মিথ্যা ও বাস্তবায়নযোগ্য নয়, এমন আশ্বাস দিচ্ছেন, তারা ভোট পাবেন না। বিশেষ করে তরুণ পৌনে চার কোটি ভোটার তাদের অপছন্দের তালিকায় রাখবে।

সূত্র মতে, গণঅভ্যুত্থানের প্রারম্ভে যে গণআকাক্সক্ষা প্রকাশিত হয়েছে প্রথমত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দল পেশাজীবীরা, সুশীল সমাজ এবং সর্বস্তরের জনসাধারণের পক্ষ থেকে যে পরিবর্তন আকাক্সক্ষা প্রদর্শিত হয়েছে- তা ছিল এক কথায় অভূতপূর্ব। বিগত অর্ধ শতাব্দী যাবত রাজনৈতিক সরকারগুলো যে যথাযথভাবে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে গ্রাহ্য করেনি, এই অভ্যুত্থান এবং অভ্যুত্থান পরবর্তী দাবি-দাওয়ার বেশুমার প্রদর্শন- জমে থাকা হতাশারই প্রমাণ। এরই মধ্যে দায়িত্ব নেয়া অন্তবর্তী সরকারের সাথে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন দূরত্ব তৈরী হয়। শেষ পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দেন। আগামী ১২ ফ্রেবুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে কাংখিত সেই জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা হলো সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা। জনগণ এমন নেতৃত্ব চায় যারা দুর্নীতিমুক্ত, জনবান্ধব, প্রতিশ্রুতিশীল এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এম এ মাননান বলেন, মানুষকে সরাসরি যেসব বিষয়গুলো প্রভাবিত করে আগামী নির্বাচনে ভোটররা এগুলোকেই বেশি প্রাধাণ্য দিবে। আমাদের প্রত্যাশা এমন নতুন সরকার আসুক, যাদের হাত ধরে গড়ে উঠবে এমন এক সুন্দর আলোকিত মর্যাদাবান বাংলাদেশ, যা বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়ে থাকবে শির উঁচু করে। যেখানে আগের মত দুর্নীতি থাকবে না। যেখানে দল নয়, মেধাকেই প্রাধাণ্য দেয়া হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দীর্ঘ পথপরিক্রমায় অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে সামরিক শাসন এবং পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিটি পর্যায়ে জনগণের ভূমিকা নিম্নমুখী হয়েছে। রাজনীতি হয়ে পড়ল অনেকটাই দলীয়করণ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেল প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে। ফলে রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন ছিল তা অনেক সময় দলীয় কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ এলেও নানা ষড়যন্ত্রে সেটিও বিফলে যাবার পথে। ভোটের মৌসুমেই দেখা মিলছে দেশ ও জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতিসহ অনেক রাজনীতিবিদের। যেহেতু ঘনিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন, রাজনীতির মাঠ তাই এখন তাদের প্রতিশ্রুতির শোরগোলে ব্যস্ত। যেখানে আছে মিথ্যা কৌশল, আশঙ্কাও। কিন্তু জনগণ খুব সহজে তা বিশ্বাস করছে না। কারণ, বাস্তবতা হলো, নির্বাচনের পর এসব নেতাদের অনেক হারিয়ে যান। অতীতে দেখা গেছে, ভোটে জয়ের পর অনেক নেতা জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। তবে এও সত্য, অনেক নেতা এখনো আন্তরিকভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য ভাবেন। কিন্তু তাদেরও নানা অপবাদ দিয়ে থামিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, যা এখনো করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমফিল গবেষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এস এম মামুন হোসেন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে জনগণের ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। জনগণ এখন চায় এমন রাজনীতি, যেখানে সর্বস্তরে সুশাসন, ন্যায্যতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনীতিতে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রায়ই অনুপস্থিত। নির্বাচনের সময় জনগণকে মনে রাখা হয়, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়েই ভুলে যাওয়া হয় তাদের কষ্ট, তাদের স্বপ্ন। তিনি আরও বলেন, দেশের বর্তমান রাজনীতিতে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তরুণেরা রাজনীতিতে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পায় না। স্থানীয় পর্যায় থেকে রাজনীতির মূলধারার আলোচনায় তারা একপ্রকার অনুপস্থিতই থেকে যায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান রাজনীতির এই মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনে তারই প্রভাব দেখা দিবে।