দিন দিন বেড়েই চলছে আবাসিক গ্যাসের সংকট। পাশাপাশি দাম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজি কিনতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্য ও নিন্ম আয়ের অনেক মানুষ। দুর্ভোগের শিকার এসব মানুষ বেছে নিয়েছে মাটির চুলা। রান্নার কাজে এখন বিকল্প হিসেবে ঢাকা শহর, শহরতলী এবং রাজধানীর আশে পাশে এলাকায় মাটির চুলা ব্যবহার করছেন অনেকে। নদী থেকে মাটি এনে শুরু হয় চুলা বানানোর কাজ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা শহরের নানা এলাকায় গ্যাস সংকট যখন নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে,তখন এই সুলভ চুলাগুলো অনেক পরিবারের শেষ ভরসা। আর সেই ভরসার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন রাজাধানীর রায়েরবাগ মোহাম্মদবাগ এলাকার নারী তাসলিমা বেগম। সংকটকে সুযোগে বদলে তারা গড়ে তুলেছেন নিজেদের ছোট্ট একটি পেশা।

তাসলিমা দৈনিক সংগ্রামকে জানান, গ্যাস সমস্যায় যাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত তাদের অধিকাংশ এখন বেঁচে আছে মাটির চুলার উপর ভর করে। ঢাকা শহরে মাটিও অমূল্য। তাই চুলা বানানোর ইচ্ছা থাকলেও উপায় মেলে না। এছাড়া পাকা বাসাবাড়িতে মাটির চুলা তোলার অনুমতি মেলাও দায়। তবে অনেক নিম্নবিত্ত মানুষের নিরাপদ ভরসা হয়ে উঠেছে এই এলাকার নারীদের হাতে বানানো মাটির চুলা।

কামরাঙ্গীচর বেড়িবাধ এলাকার বাসিন্দা মোমেনা আক্তার দৈনিক সংগ্রামকে জানান, বাসায় গ্যাস নেই । এলপিজির দাম বেশি এখন রান্না করে খেতে তো হবে তাই বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় রান্না করা হয়।

সূত্র জানায়, ঢাকা শহরে লেগে থাকে নিত্যনতুন সমস্যা। এবারে নতুন সংযোজন গ্যাসের সংকট। শহরের অনেক এলাকাতেই সেটি প্রকট হয়ে উঠছে ইদানিং। কিছু কিছু এলাকায় বিষয়টি আরও তীব্র। হাজারীবাগ, লালবাগ, সিকশন, মিরপুর, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ এর কথা না বললেই নয়। একদিকে লাইনের গ্যাসের সংকটের কারণে রাজধানীবাসীর ভোগান্তি চরমে। চুলায় চাল বসানো হয়েছে ঘন্টা দুই। তবু ভাত হচ্ছে না গ্যাসের গতি স্বল্পতার কারণে। একদিন, দুইদিন না। রোজই এক সমস্যা। আবার তার উপর সিলিন্ডার গ্যাসের দামও বেড়ে চলেছে। চড়া দাম দিয়ে সিলিন্ডার গ্যাস কিনে রান্না খাওয়ার মতন আর্থিক সামর্থ্য নেই নুন আনতে পান্তা ফুরোনো পরিবারগুলোর। কিন্তু এ থেকে উত্তরণের পথ কী? সেই পথ বের করতে এগিয়ে এসেছে কামরাঙ্গীচরের অতি সাধারণ এই নারীরা।

সকালের আলো ঠিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই কামরাঙ্গির চরের নূরজাহান বেগম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। সাদা-কালো চুলের ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধার তাতে কোনো বিরক্তি নেই। বরং বেশ উৎসাহ নিয়েই কাজটি করেন। বেড়িবাঁধ এলাকার এই নারী প্রতিদিন নদীর ধারে যান। সেখানে নেমে নিজ হাতে তুলে নেন মাটি। সেই মাটিই তার সারাদিনের সঙ্গী, জীবিকার উৎস।

নদী থেকে মাটি এনে শুরু হয় চুলা বানানোর কাজ। মনোযোগের সাথে চলে ডিজাইন করার কাজও। এভাবে সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। কাজ শেষে যত্নে গড়া মাটির চুলা সারিবদ্ধ করে রোদে শুকানোর জন্য রাখেন তিনি। তারপর আবার একই রুটিনে কাজ চলে তার। নানান স্থান থেকে ক্রেতারা আসেন, দেখে যান। কেউ কেউ যাচাই-বাছাই সেরে কিনে নেন পছন্দের চুলাটি।

নূরজাহানের এই কাজে আসা মাস চারেক আগে। সবে বরিশাল থেকে এসেছেন এই এলাকায়। অন্যদের দেখাদেখিতে শুরু করেছেন। তবে এই বেড়িবাঁধ এলাকায় মাটির চুলা তৈরির ইতিহাস আরও পুরোনো। প্রায় বছর দশেকের মতো সময় ধরে চলছে এই কাজখানা। কাজ শেষে যত্নে গড়া মাটির চুলা সারিবদ্ধ করে রোদে শুকানো হয়।

সাধারণত শীতকালেই মাটির চুলা বানানোর মৌসুম। কারণ এই সময়েই গ্যাসের সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। তবে এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। লাইনে গ্যাস একেবারেই না থাকা, সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়া সব মিলিয়ে সংকট আরও তীব্র। ফলে শীত-গ্রীষ্মের হিসাব ভেঙে এখন প্রায় প্রতিদিনই চুলা বানাতে হচ্ছে তাদের। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এসে কিনেও নিয়ে যাচ্ছেন।

পঁচিশ বছর বয়সী ঝুমুরের এই কাজে আসা বছরখানেক আগে। মূলত দর্জির কাজ করেন তিনি। তবে সে আয়ে সংসারের খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই চুলা তৈরির কাজও করছেন। এরই মধ্যে নিজের তৈরি করা দশটি চুলা বিক্রি করেছেন।

ঝুমুরের ভাষ্য, কামরাঙ্গীচরের প্রায় ছয় থেকে সাতজন নারী নিয়মিত এই কাজ করছেন। এর মধ্যে তিনি নিজে বিক্রি করেছেন প্রায় দশটির মতো চুলা। বিক্রি ভালো হওয়ায় অন্য নারীরাও এই কাজ করার উৎসাহ পাচ্ছেন। ঝুমুর নিজে এই কাজ করছেন প্রায় দুই বছর ধরে। সংসারের দায় দায়িত্ব, নিত্যদিনের খরচ-সব মিলিয়ে এই আয় তাদের জন্য বড় ভরসার জায়গা তৈরি করেছে।

শুধু কামরাঙ্গীচরের মানুষরা নয়, হাজারীবাগ, লালবাগ, সিকশন, কেরানীগঞ্জ, মিরপুর, গাবতলী-ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ কিনে নিচ্ছেন এসব মাটির চুলা। চুলার দাম নির্ভর করে আকার ও নকশার ওপর। ছোট চুলা পাওয়া যায় ২০০ টাকায়। মাঝারি চুলার দাম ৩০০ টাকা। আর বড়, ভালো ডিজাইন করা, শক্ত মাটির চুলার দাম ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও ১০০ বা ৪০০ টাকাতেও চুলা বিক্রি হয়। দাম কম হলেও ব্যবহারিক দিক থেকে এসব চুলা অনেকের জন্য স্বস্তির।

মানুষের কেনার কারণও স্পষ্ট। সেমিপাকা বাসা, অনিয়মিত গ্যাস সংযোগ কিংবা একেবারেই গ্যাস না থাকা পরিবারগুলো রান্নার জন্য বিকল্প খুঁজছেন। সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের কাছেই তা এখন বিলাসী পণ্য। ফলে ভরসা বলতে লাকড়ির চুলা। এই কাজ করতে গিয়ে নারীদের দিন কাটে ব্যস্ততায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুলা বানানো, শুকানো, সাজিয়ে রাখা। এর ফাঁকেই চলে রান্না, সংসারের অন্য কাজ।

নূরজাহান বলেন, এই কাজে তিনি খুশি। নিজের হাতে কিছু টাকা আসে। মানুষের উপকার হয়। তাছাড়া অবসর সময়টাও কাজে লাগছে। শুরুতে মাত্র চারটি চুলা বানিয়েছিলেন। সেগুলো বিক্রি করে সেদিন আয় হয়েছিল দুই হাজার টাকা। সেই দিন থেকেই এই কাজের প্রতি তার আলাদা টান।

রাজধানীর পাশে নারায়ণগঞ্জের চিত্র:

এদিকে আবাসিক লাইনে গ্যাস নেই বাজারে এলপিজি নেই অনেকটা বাধ্য হয়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মাটির তৈরী চুলা। জেলার বিভিন্ন স্থানে তৈরী হচ্ছে মাটির চুলা। বিক্রিও চলছে পুরোদমে। অনেকটা বাধ্য হয়েই মাটির তৈরি চুলা ব্যবহার করছে মানুষ।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, এলপিজি গ্যাস বিক্রি বন্ধ থাকায় কদর বেড়েছে লাকড়ির চুলার। হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এলপিজি গ্যাস না পেয়ে লাকড়ির দোকানগুলোতে ভিড় করছেন।

সূত্র জানায় , এলপিজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সারাদেশের মতো বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে উচ্চমূল্যে গ্যাস বিক্রির দায়ে দোকানিদের জরিমানা করা হয়। এর কয়েকদিন পরই সারাদেশে এলপিজি গ্যাস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। ফলে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। কবে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে, তা এখনও অনিশ্চিত।

এ অবস্থায় গ্যাসের চুলার বিকল্প হিসেবে নারায়ণগহ্জে লাকড়ির চুলার কদর বেড়েছে। আবাসিক গ্রাহকরা ঝুঁকছেন লাকড়ির চুলার দিকে। একই সঙ্গে বেড়েছে চুলা প্রস্তুতকারীদের ব্যস্ততা। আগে যেখানে লাকড়ির চুলার বিক্রি খুবই কম ছিল, সেখানে এখন নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নসহ সিটি এলাকার বন্দর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের শাহীমসজিদ, ছালেহনগর, এনয়েতনগর; ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দর বাজার, খানবাড়ি; ২৩ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাকান্দা, মাহমুদনগর; ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের মদনগঞ্জ; ২৪ নম্বর নবীগঞ্জ, লক্ষণখোলা, দাসেরগাঁও; ২৭ নম্বর হরিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট চলছে।

ঘাড়মোড়া এলাকার মাটির চুলা প্রস্তুতকারক সেলিম মিয়া বলেন, “আগে লাকড়ির চুলা তেমন বিক্রি হতো না। এখন নিয়মিতই বিক্রি হচ্ছে। রড, বালু ও সিমেন্টের সমন্বয়ে এসব চুলা তৈরি করা হয়। প্রকারভেদে দাম ভিন্ন। ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় চুলা বিক্রি হচ্ছে।”

বন্দর রেললাইন এলাকার স্যানিটারি ব্যবসায়ী সোহাগ বলেন,আমার দোকানে কয়েকটি চুলা তৈরি করা ছিল। গত কয়েকদিনেই সব বিক্রি হয়ে গেছে। এখন নতুন করে চুলা তৈরি করছি। আগের তুলনায় চাহিদা অনেক বেড়েছে।

আরেক বিক্রেতা জুলহাস দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, “প্রতিদিনই মাটির চুলা বিক্রি হচ্ছে। ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকায় চুলা বিক্রি করছি। শহর ও বন্দরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে চুলা নিয়ে যাচ্ছেন।