- সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে ২৭ হাজার টন ডিজেল, ৬০ হাজার টন বন্দরের পথে
- তেলের জন্য ছুটির দিনেও পাম্পে দীর্ঘ লাইন
- শিগগিরই জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত : অর্থমন্ত্রী
বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে উচ্চমূল্যে জ¦ালানি ক্রয় করছে সরকার। সংকট সামাল দিতে নানামুখী চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে। তবে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির কারণে সরকারি তহবিলে চাপ বাড়ায় শেষ পর্যন্ত জ¦ালানি তেলের দাম বাড়াতে পারে সরকার। অনেকটা সেদিকেই হাঁটছে। জ¦ালানি তেলের দাম যে বাড়ানো হচ্ছে সে বিষয়ে অনেকটা ঈঙ্গিত দিয়েছে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কোরিয়ান ইপিজেডে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির কারণে সরকারি তহবিলে চাপ বাড়ায় দেশের স্বার্থে শিগগিরই জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সরকারি তহবিল যদি এভাবে উচ্চমূল্যে ক্রয়ের কারণে ক্ষয় হতে থাকে, তাহলে উন্নয়ন কার্যক্রম ও সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তাই দেশের স্বার্থে একটি পর্যায়ে গিয়ে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ জ্বালানি ওই অঞ্চল থেকে আসে, তাই সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। তিনি জানান, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে সরকার আপস করছে না। তবে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত থাকায় সরকারি তহবিলে চাপ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বহন করা কঠিন হবে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার সাশ্রয়ী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং চালু করা হয়েছে। তার নিজের ক্ষেত্রেও ৩০ শতাংশ জ্বালানি রেশনিং করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে এখন পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষি কার্যক্রম সচল রাখতে সরকার সফল হয়েছে।
এদিকে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে বিরাজমান অস্থিরতা ও মজুত সংকটের শঙ্কা কাটাতে বড় ধরনের স্বস্তির খবর দিচ্ছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। চলতি মাসেই ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের বেশ কয়েকটি বড় চালান দেশে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সাময়িক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, নতুন উৎস থেকে তেল আমদানি এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, শুক্রবারে ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। গতকাল শুত্রবার রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ‘এমটি ইউয়ান জিং হে’ নামে একটি জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে ধাপে ধাপে আরও কয়েক লাখ টন জ্বালানি তেল আসার শিডিউল চূড়ান্ত হয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ডিজেলের যে মজুত রয়েছে, তার সঙ্গে নতুন আমদানিকৃত তেল যুক্ত হলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এপ্রিলে ডিজেলের মোট চাহিদার বিপরীতে বিপিসি ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরের ইউনিপ্যাক এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি কোম্পানি থেকে বড় অংকের তেল আমদানির নিশ্চয়তা পেয়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমেও ডিজেল আসার প্রক্রিয়া সচল রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়াত হামিম বলেন, মালয়েশিয়া থেকে ডিজেল নিয়ে আরেকটি জাহাজ বন্দরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। জাহাজটি গত ২৯ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। জাহাজটি বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে রয়েছে। শুক্রবার রাতে বন্দরে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া চীন থেকে রওনা দেয়া আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ শনিবার নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে।
বিপিসির সহকারী ব্যবস্থাপক ফারজিন হাসান মৌমিতা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেল নিয়ে আসা নবম জাহাজটি ইতোমধ্যে পৌঁছেছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
শুধু ডিজেল নয়, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত নিয়েও এই মুহূর্তে কোনো দুশ্চিন্তা নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। বেসরকারি শোধনাগার এবং আমদানিকৃত অকটেন দিয়ে বর্তমান চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘাটতি মেটাতে কিছু পরিমাণ অকটেন পেট্রোলে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সফল কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোর বাংলাদেশে আসার পথ সুগম হয়েছে।
এছাড়া এমটি নরডিক পলুকস নামক জাহাজে আটকে থাকা ১ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল ছাড়িয়ে আনতেও বিশেষ আলোচনা চলছে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী বন্দর থেকে আরও এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল কেনা হয়েছে, যা আগামী মাসের শুরুতে দেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বর্তমানে নিজস্ব মজুত দিয়ে উৎপাদন চালু রাখলেও নতুন আসা অপরিশোধিত তেল থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েল পাওয়া যাবে। জ্বালানি তেলের উৎস বহুমুখীকরণ করতে সরকার এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না থেকে নাইজেরিয়া, কাজাখস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো থেকে তেল সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এমনকি রাশিয়ার ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল হওয়ায় দেশটি থেকে বড় অংকের ডিজেল আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ এবং দ্রুত আমদানির ফলে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা দূর হচ্ছে এবং তিন মাসের অগ্রিম মজুত তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ।
জানা গেছে, চাহিদা অনুসারে আগামী জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল আগে থেকেই কেনা আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সময়মতো জাহাজ আসতে না পারায় কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। গত মাসে ৬টি ডিজেলের জাহাজ আসতে না পারায় দেড় লাখ টন ডিজেলের মজুত কমেছে। এর মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কের কারণে বাড়তি জ্বালানি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গত বছরের মার্চের তুলনায় এবার মার্চে ডিজেল ও পেট্রোল সরবরাহ কিছুটা কমানো হলেও অকটেনের সরবরাহ হয়েছে আগের চেয়ে বেশি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ লাইন কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এরই মধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকার সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে জ্বালানি সংকট ও ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকারি ব্যয় কমাতে একগুচ্ছ কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
তেলের জন্য ছুটির দিনেও পাম্পে দীর্ঘ লাইন :
ছুটির দিন শুক্রবারও রাজধানীর তেলের পাম্পগুলোতে ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও তেলের দেখা পাচ্ছেন না অনেকেই। বাইকার ও গাড়ি চালকদের অভিযোগ, সব মেশিন চালু না রাখায় দীর্ঘসূত্রিতায় পড়তে হচ্ছে অসহনীয় দুর্ভোগে। ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী তেল না আসায় বাড়ছে জটিলতা। তবে দীর্ঘসূত্রিতা সমাধানের চেষ্টা করছেন তারা। শুক্রবার রাজধানীর তেলের পাম্পগুলো ঘুরে এই চিত্র দেখা যায়।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন বাইকার ও গাড়ির চালকরা। রাত ১০টা থেকে লাইন ধরে সকাল পর্যন্ত তেল নিতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকেই। তারা অভিযোগ করেন, রাত থেকে একটি নজেলে গাড়ি ও বাইকের তেল দেয়ায় এত দীর্ঘ সময়ের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে গ্রাহকদের।
বাইক রাইড শেয়ারিং করেই চলেন তাহসিন। বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় তেল নিতে এসে না পেয়ে শুক্রবার আসেন । তবে বেলা গড়িয়েও পাননি তেলের দেখা। দীর্ঘ সময় লাইনে থাকায়, পায়ের ব্যথায় নিরুপায় হয়ে বসে পড়েছেন সড়কে। একই অবস্থা রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা সব গ্রাহকের। খাওয়া আর ঘুম বাদ দিয়ে লাইন ধরে বসে আছেন তেলের জন্য। এমন পরিস্থিতিতে ক্লান্ত আর পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েন অনেকেই।
এদিকে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে তাদের। যে কারণে ধীর গতিতে তেল দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। দীর্ঘ সময়ের জটিলতা কমিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন বলেও জানানো হয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে।