সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি - জামায়াত

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি-স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

বিভিন্ন স্থানে প্রচারণায় হামলা

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট হতে পারে

চলতি সপ্তাহেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এখনো প্রচারণায় সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারার অভিযোগ রয়েছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। তফসিল ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতিও হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনের প্রার্থী ও প্রচারণার কর্মীদের উপর হামলা করা হচ্ছে। এমনকি নারী কর্মীরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়াও নানা কারণে হত্যার ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনে আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

সূত্রমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন কমিশন। আগামী কাল বুধবার রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত করবে নির্বাচন কমিশন। তারপর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া রের্কডকৃত ভাষণের মাধ্যমে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। আগামীকাল বুধবার অথবা পরদিন বৃহস্পতিবার এ তফসিল ঘোষণা হতে পারে। একই দিন গণভোট ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে তফসিল ঘোষণার সময়ও নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তথা লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ করছে রাজনৈতিক দলগুলো।

গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। তারা মনে করছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে তফসিল চূড়ান্তের প্রস্তুতি চললেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কিংবা সবার জন্য সমান সুযোগ ‘সুনিশ্চিত হয়নি’। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলার মাঝে মাঝে খুব গুরুতর অবনতি আমরা দেখছি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারেনি। এইসব পরিস্থিতি নিয়েই আমরা মূলত নির্বাচন কমিশনকে বলেছি এখনই সিরিয়াস না হলে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে?

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আইন-শৃঙ্খলার যে মাঝে মাঝে খুব গুরুতর অবনতি আমরা দেখছি, একটা দলের সভার উপরে অন্য দলের হামলা; ইভেন নারীরাও তাদের ভোটের কাজে ভোটের সমাবেশে গিয়ে নির্যাতিত, নিপীড়িত, হামলার শিকার হচ্ছে, আহত হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি নিয়েই আমরা মূলত নির্বাচন কমিশনকে বলছি এখনই সিরিয়াস না হলে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে?

নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের উপর সন্ত্রসাীদের হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির নেতকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব হামলার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এসব হামলা বন্ধের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তফসিল ঘোষণার পর ইসি তা কতটুকু সামাল দিতে পারবে সে নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জানা গেছে, গত রোববার বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বক্তব্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ করায় তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা করেন বিএনপির একদল নেতাকর্মী। তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে এবি পার্টির কয়েক নেতাকর্মী মারধরের শিকার হয়েছেন।

গত ৩ ডিসেম্বর নরসিংদী -২ (পলাশ) নির্বাচনী এলাকায় জামায়াতের নির্বাচনী সভায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় ছাত্রশিবির সহ ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনের জামায়াতের প্রার্থী মো. আমজাদ হোসাইন। এ ঘটনার পর থেকে জামায়াতের ৩ জন নেতাকর্মী নিখোঁজ বলেও দাবি করেন তিনি। গত ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মেহেরপাড়া ইউনিয়নের শেখেরচর বাসস্ট্যান্ডে আয়োজিত সভায় ইউনিয়ন তাঁতীদল নেতা বখতিয়ার হোসেন বখতিয়ারের নেতৃত্বে এ হামলা হয়। আহতদের মধ্যে ৭ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ হামলার প্রতিবাদে রাত ৮টার দিকে জেলা শহর ও পলাশে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জামায়াতের নেতাকর্মীরা।

এদিকে গত মাসে ঢাকা-২ (ঢাকার কেরানীগঞ্জের একাংশ) আসনে নির্বাচনী প্রচারের সময় জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।

এমন অভিযোগে ঢাকা-২ আসনে জামায়াতের সহকারী আসন পরিচালক মহিউদ্দিন সেলিম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এতে উল্লেখ করা হয়, কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া ইউনিয়নের নীলটেক এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

মহিউদ্দিন সেলিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচনী প্রচারপত্র বিলি করছিলেন। তখন আরেক নারী কর্মী মুঠোফোনে দৃশ্য ধারণ করছিলেন। ঠিক সে সময় বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী ভিডিও ধারণকারীর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তখন অন্য নারী কর্মীরা বাধা দিলে তাদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও ওড়না টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। একপর্যায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা আমাদের নারী কর্মীদের লাথি ও কিল-ঘুষি দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করার পর ওসি সাহেব ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

ঢাকা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী তৌফিক হাসান বলেন, ইতিপূর্বে বিএনপির কর্মীরা তাঁর নির্বাচনী গণসংযোগে হামলা করেছেন। তাঁরা তাঁর নির্বাচনী পোস্টার ক্রমাগত ছিঁড়ে ফেলছেন। এ ছাড়া তাঁরা জামায়াতের কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকিও দিচ্ছেন।

আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচনের আগে এগুলো সব বন্ধ হয়ে যাবে তা-ও আমি বলতে পারি না। যদি আমার কাছে কোনো ম্যাজিক থাকত বা সুইচ লাইট অনÑঅফের মতো কিছু থাকত, আমি বন্ধ করে দিতাম। যে লাইট অফ এখন আর কোনো কিলিং হবে না। আমার কাছে এ রকম কোনো ম্যাজিক নেই।

রংপুরে নিজ বাসায় মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর স্ত্রী হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলার সময় এক সাংবাদিক জানতে চান, নির্বাচনের আগে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে তিনি কীভাবে দেখেন। উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন বলে নয়, নির্বাচনের আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচনের প্রস্তুতি ভালো। সব বাহিনী প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের প্রশিক্ষণের মান দেখতে যাব। জানুয়ারির মধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অবাধ উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য যত ধরনের প্রস্তুতি দরকার তাই নিচ্ছি।’

তফসিল ঘোষণা: বুধবার বিটিভি ও বেতারকে ডেকেছে ইসি

এদিকে রেকর্ডের জন্য ১০ তারিখে ডাকা হয়েছে, তবে কোন সময় রেকর্ড হবে তা কমিশন জানিয়ে দেবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা ও প্রচারের জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বেতারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণ রেকর্ড করতে ডাকছে নির্বাচন কমিশন। এ ভাষণ বুধবার রেকর্ড করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি। সোমবার বিটিভি ও বেতারকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হচ্ছে।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের ভাষণ রেকর্ডের জন্য বিটিভি ও বেতারকে ১০ তারিখে ডাকা হয়েছে। তবে কোন সময় রেকর্ড হবে তা কমিশন জানিয়ে দেবেন।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “বিটিভি ও বেতারকে চিঠি দিচ্ছে ইসি সচিবালয়। ভাষণের মাধ্যমে তফসিল হবে। ১০ ডিসেম্বর হতে পারে। আর তো সময় নেই, ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল দিতে হবে। ভাষণ রেকর্ডের দিন দুপুরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও ইসির সাক্ষাতের সূচি রয়েছে।

সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন হওয়ার পর পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন।

তিনি বলেন, আগামী ১০ ডিসেম্বরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারে একটা ভাষণ রেকর্ড করবেন। এখন রেকর্ডের বিষয়বস্তুটা এবং সময়টা এটা স্যার নির্ধারণ করবেন। কিন্তু একটা রেকর্ডিং হবে এটুকু আমার জানা আছে এবং সেটা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।আর আরো দুটো বিষয় আছে। সেটা হচ্ছে যে আপনার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যারা দেশের অভ্যন্তরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তারা তফসিল ঘোষণার থেকে ১৫ দিনের ভিতরে নিবন্ধন করবেন, যেন তারা তাদের নির্ধারিত ঠিকানায় আপনার পোস্টাল ব্যালটটা পেতে পারেন।

তিনি বলেন, নির্বাচনের কার্যক্রমের সাথে সরাসরি যুক্ত হবেন যাদের ডেপ্লয়মেন্টটা পরে হবে। যেমন আপনার পাঁচ দিন অথবা সাত দিনের জন্য যাদের ডেপ্লয়মেন্ট তাদের নিবন্ধনটা পরবর্তীতে থাকবে। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী এবং যারা আইনি হেফাজতে আছেন তাদেরটা তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ১৫ দিনের ভিতরে কমপ্লিট করতে হবে।

সাধারণত যেদিন রেকর্ড হয় ওই দিনই তফসিল ঘোষণা হয়- এমন বিষয় সামনে আনলে তিনি বলেন, আমি আপনাদেরকে বলেছি যে রেকর্ডিং এর বিষয়বস্তু এবং কখন করবেন এ সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আমি যখনই দেখুন আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন ১০ তারিখে রেকর্ড করা হবে কিনা আমি বললাম যে হ্যাঁ হবে। রাষ্ট্রপতির কাছে সাক্ষাতের সময়টা জানানো হয়নি, আমি আশা করছি যে কালকে নাগাত জানানো যাবে।

সিভিল সার্ভিস এসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের বিষয়ে জানতে চাইলে-তিনি বলেন, তারা এসে আমাদেরকে জানিয়ে গেছে যে সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন থেকে যত টুকু সহযোগিতা প্রয়োজন তার থেকে বেশি ছাড়া কম করা হবে না।

নির্বাচনি পরিচালনা ম্যানুয়াল ছাপানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ম্যানুয়াল প্রিন্টিং এখনো হয়নি, তার কারণ হচ্ছে যে আমরা এখনো তিনটা বিষয় আইন মন্ত্রণলায়ের লেজিসলেটিভ ডিভিশন থেকে এখনো পাইনি। আরপিও লাস্ট অ্যামেন্ডমেন্ট যেটা নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা এবং রাজনৈতিক দল প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার সংশোধনী এই তিনটা এখন আমরা হাতে পাইনি। এটা তিনটা পেলেই ম্যানুয়াল গুলো প্রিন্টিংয়ে দেওয়া যাবে।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের অবস্থানগতভাবে যে প্রস্তুতিটা ছিল তা চূড়ান্ত এবং আপনারা জানেন যে ভোটার তালিকা আমরা চূড়ান্ত করে লিংক দেওয়া হয়েছে উপজেলা পর্যন্ত, এখন সেই লিংক অনুযায়ী তারা কাজ করছেন। আর বাকিটুকু তো আরো কিছু কাজ আছে যেমন রেজিস্ট্রেশনের পরবর্তীতে আইসিপিভি (ইন কান্ট্রি ভোটিং) এবং আপনার ওসিভি (আউট কান্ট্রি ভোটিং) ওয়াটারমার্ক করে ভোটার তালিকাগুলোকে চূড়ান্ত করার এ কাজটা আরো পরে হবে।