সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ও গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট মতামত লিপিবদ্ধ থাকতে হবে।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় কেমন ইশতেহার চাই’ শীর্ষক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি একথা বলেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ও ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, সুজনের কোষাধ্যক্ষ ও সুজন ট্রাস্টি বোর্ডের ট্রাস্টি সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য ও নির্বাচন কার্যক্রম সমন্বয়ক একরাম হোসেন এবং সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শুধু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, গণতান্ত্রিক উত্তরণে যেতে হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হবে। প্রতিবারই যেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আইন মেনে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক না হলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না।

বদিউল আলম বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার প্রকাশ করছে, এক্ষেত্রে এতে কী কী বিষয়গুলো থাকা দরকার, সেগুলোর ওপরে আলোকপাত করে আমরা আজ দাবি জানাচ্ছি যে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কার কমিশন সমূহের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে স্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার এতে থাকতে হবে। বিশেষভাবে আমরা দাবি করেছি, আমাদের যে গণভোট হবে রাজনৈতিক দলগুলো সে ব্যাপারে তাদের অবস্থান ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’ সেটা যেন সুস্পষ্ট করে।’

তিনি বলেন, আমরা মনে করি, নির্বাচনী ইশতেহার একটা লিখিত, স্বাক্ষরিত দলিল। এই দলিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে তাদের মতামত ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এখানে তাদের মতামতগুলো সুনির্দিষ্ট থাকা দরকার ও অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন হওয়া বাধ্যতামূলক।

তিনি আরো বলেন, দ্বিতীয়ত আমরা চাই রাষ্ট্রযন্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক, যাতে গুম-খুন বা অতীতে যা যা হয়েছে এগুলো যেন বন্ধ হয়। তৃতীয়ত, আমরা চাই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে কতগুলো প্রতিষ্ঠানের ওপর এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শক্তিশালী না হয়, কার্যকর না হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা কার্যকর হয় না। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করতে হবে।

চার নম্বর হলো- সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে কাঠামোগত সংস্কার। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে একই সাথে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক এবং আমরা চাই এই নির্বাচনের মাধ্যমে যেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটে, প্রাতিষ্ঠানীকরণ হয়। সেজন্য গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক দল দরকার, তিনি বলেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই নিশ্চিত করতে হবে জানিয়ে ড. বদিউল আলম বলেন, দুর্নীতি আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে, পেছন থেকে টেনে রাখছে, তাই দুর্নীতি দমন কমিশনকে আমরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করার দাবি করছি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী অভিযান পরিচালনার আমরা অঙ্গীকার দেখতে চাই।

তিনি বলেন, এরপর আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছি, এজন্য আমাদের তরুণদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ এবং মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। তাদের জন্য যদি মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারি, তাদের জন্য যদি সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি তবে ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্ড বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর আমরা অঙ্গীকার দেখতে চাই।

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, এমন ১৫টি বিষয় সুজনের পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলনে তুলে ধরেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। বিষয়গুলো হলো জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে স্পষ্ট অঙ্গীকার। রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা। গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক দল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই। মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার। সহনশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো। চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে দৃঢ় অঙ্গীকার। নারী ক্ষমতায়নের অগ্রাধিকার। শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। ন্যায়সংগত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান। পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রেক্ষাপটে অবস্থান। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন।