ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির তৃতীয় দিন আজ মঙ্গলবার। ভাষা শহীদদের বীরত্বগাঁথার পুনরাবৃত্তি আর স্মৃতিরোমন্থনের বার্তা নিয়ে আসে এই ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালে ঢাকা শহরের পিচঢালা রাস্তা তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ছিল বলেই আজ বাংলায় কথা বলি গর্বভরে।
ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক নিবন্ধে লেখেন, “বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন জাতীয় চরিত্রের একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন। সূচনায় ছাত্র-আন্দোলন হিসেবে এর প্রকাশ ঘটলেও দ্রুতই তা দেশজুড়ে গণ-আন্দোলনে পরিণত হয় সর্বশ্রেণির মানুষের সমর্থন নিয়ে। এর মূল দাবি পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও এ আন্দোলন দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে বাঁকফেরা গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। প্রমাণ, বায়ান্ন থেকে পরবর্তী কয়েক বছরের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন।... সত্যি বলতে কি, ভাষা আন্দোলনের দু-একটি প্রামাণ্য গ্রন্থের কথা বাদ দিলে ভাষা আন্দোলনের তথ্যবিকৃতি, মূল্যায়নবিকৃতি ঘটেছে নানাভাবে, বিশেষ করে আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট কুশীলবদের নৈরাজ্যিক স্মৃতিচারণায়। এ ধারাতেই তথ্যগত ভুলভ্রান্তি সর্বাধিক এবং সম্ভবত বিস্মৃতি বা ঝাপসা স্মৃতির কারণে। এ ছাড়া কখনো মতাদর্শগত বৈপরীত্যও এ ধরনের বিকৃতির কারণ।
এম আর মাহবুবের ‘বাংলা কী করে রাষ্ট্রভাষা হলো’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “১৯৫২ সালে একটি রক্তস্নাত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর সতের দিনের মাথায় তমদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।” খুরশীদ আলম সাগরের ‘পলাশী প্রান্তর থেকে বাংলাদেশ ১৭৫৭-১৯৭১ ও আমাদের স্বাধীনতা’ শীর্ষক গ্রন্থে ভাষা আন্দোলন বিষয়ে উলেখ করা হয়েছে- “সাংগঠনিক পর্যায় শুরু হয় তমদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে। মত প্রকাশের একটি অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবে এটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালে ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র এবং অধ্যাপকের উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়। উদ্দেশ্য বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়াস চালানো। অক্টোবর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক মুসলিম হলে সাহিত্য সভা অনুষ্ঠানের পর তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগেই সর্বপ্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। তমদ্দুন মজলিসের অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের তৎকালীন তরুণ শিক্ষক ড. এএসএম নূরুল হক ভূঁইয়া প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।”
এমএ বার্নিকের ‘ভাষা-আন্দোলন সারগ্রন্থে’ উল্লেখ করা হয়েছে, “তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটিতে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বলা হয়। তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটি নামে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় ৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে। মজলিসের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ড. এ এসএম নূরুল হক ভূঁইয়া উক্ত কমিটির আহ্বায়ক নিযুক্ত হন। এ কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিলো ২৮ জন। তবে কমিটির মূল পরিচালনায় ছিলেন তমদ্দুন মজলিস প্রধান অধ্যাপক (পরে প্রিন্সিপাল) আবুল কাসেম। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পাশাপাশি পূর্ব-বাংলার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তুলে ধরার কাজ করেছে এ কমিটি।” উক্ত গ্রন্থে আরো বলা হয়, “বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটি বিশিষ্ট মহল, আইন পরিষদ সদস্য ও ছাত্র সমাজের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিস তথা প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিটি সাধারণ সাংস্কৃতিক ফোরাম থেকে রাজনৈতিক ফোরামে এবং সরকারের কাছে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরার যে কাজটি তারা করেছেন, তা ভাষা-আন্দোলন এবং বাংলাদেশ ও জাতির ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা বলে বিবেচিত হচ্ছে।