আজ রোববার ২২ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এদিনটিতে কেবল পাকিস্তানী সৈন্যদের আবাসস্থল ক্যান্টনমেন্টগুলো ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশনেও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়নি। সচিবালয়সহ সকল সরকারি অফিসেও বাংলাদেশের পতাকাই পত্ পত্ করে উড়েছে। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে শতকরা ৫৬ ভাগ জনঅধ্যুষিত পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তানকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের দৃঢ়চেতা মনোভাবকেই জানান দিলো।
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ বাংলাদেশের সর্বত্র, এমনকি বাসাবাড়ির ছাদে, গাছে, রাস্তায়, যানবাহনে, যার যেখানে সম্ভব হয়েছে, সেখানেই প্রতিবাদস্বরূপ কালো পতাকা উত্তোলন করেছে। মুক্তিকামী বাঙালী সেই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাও প্রদর্শন করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসের দিন বাংলাদেশের সর্বত্র পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার পরিবর্তে কালো পতাকা প্রদর্শনের নির্দেশ দিলে বাঙালী সে নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাসাবাড়িতে কালো পতাকা এবং সেই সাথে সোনার বাংলার জাতীয় পতাকাও প্রদর্শন করে। ওই দিন সর্বত্র কালো পতাকা আর জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অভূতপূর্ব দৃশ্য এদেশে আর কখনও দেখা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনেও সেদিন ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় শ্রমিক পরিষদ’ এর নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। উল্লেখ্য, লেখক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বন্দীশিবিরে নির্যাতিত হন।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা এদিন আবেগাপ্লুত অযুত জনতার মিছিল ঊর্মিমুখর। ভোর রাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা রাস্তায় তাদের টহল জোরদার করাসহ বিভিন্ন কর্মপন্থা গ্রহণ করবে বলে আগের দিন আশঙ্কা করা হয়েছিল। তা না হওয়ায় জনতার প্রাণচাঞ্চল্য এবং আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গিয়েছিল। তাই এতো মিছিল। প্রায় প্রতিটি মিছিলের সামনে এসেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেশ উৎফুল্ল, অথচ দৃঢ়তার সাথেই একটি কথা বার বার বলেছিলেন, সংগ্রাম আর স্বাধীনতা আমার জীবনের মূলমন্ত্র। সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীন করতে হবে। বেলা তিনটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত মিছিল কিছুটা কমে আসে। সে সময় শেখ মুজিব তার বাসভবনে উপস্থিত দেড় শতাধিক দেশী-বিদেশী সাংবাদিকের সাথে লনে বসে কথাবার্তা বলেন। বিকেল পাঁচটায় আবার মিছিলের ঢল নামে এবং তা প্রায় রাত ৯টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এ সময় উৎফুল্ল জনতার মাঝে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু।
প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘জয় বাংলা বাহিনী’ পল্টন ময়দানে কুচকাওয়াজ করে। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ জাতীয় সঙ্গীত ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কুচকাওয়াজ শুরু হয়। দুপুর বারোটায় রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশে শেখ মুজিব জয় বাংলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক অভিবাদন গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের পতাকা আন্দোলিত করে এবং গণবাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, সাড়ে সাত কোটি মানুষের দাবির প্রশ্নে আপোষ নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের যৌথ উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমে এক গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন ছাত্রনেতা আ স ম আব্দুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ। মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ ধ্বনির মধ্যে শ্রমিক ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেন, আমরা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছি, কাজেই যে পতাকা আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, তা পুনরায় তোলা বা স্বাধীনতা থেকে পিছপা হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যে কোন কিছুর বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করাই আজ সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর পবিত্র কর্তব্য।
এদিকে রণপ্রস্তুুতির ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় কঠোর সেনা প্রহরায় কুর্মিটোলা সেনানিবাসে যান। গত ১৫ মার্চ ঢাকা আগমনের পর প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট হাউজের বাইরে সেনানিবাসে যান তিনি। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা অবস্থানের পর জেনারেল ইয়াহিয়া সেনানিবাস ত্যাগ করে স্বীয় ভবনে প্রত্যাবর্তন করেন। পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট হাউজে লে. জেনারেল পীরজাদার সাথে ৭৫ মিনিট আর দলীয় লোকদের সাথে গভীর রাত পর্যন্ত পৃথকভাবে বৈঠক করেন।