শীতের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। সর্বনিম্ন্ন তাপমাত্রা কমছে। কমতে কমতে ৭ ডিগ্রীর নিচে নেমে এসেছে। গতকাল বুধবার দেশের সর্বনিম্ন্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দেশের উত্তরের জনপদ নওগাঁর বদলগাছীতে। এ তাপমাত্রা এই মৌসুমের সর্বনিম্ন্ন বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে কনকনে শীতের তীব্রতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে জেঁকে বসেছে শীত, তাপমাত্রার পারদ নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অধিকাংশ জেলায় ভোরের আকাশে আলো ছড়ানোর আগেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে মাঠ-ঘাট, সড়ক-জনপদ। রাত যত গভীর হয়, কুয়াশার ঘনত্ব ততই বাড়ে। হিমেল বাতাসের তীব্র ঠান্ডা আর কুয়াশার দমবন্ধ করা পরিবেশ মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে হাড়কাঁপানো শীত।
বৈরী আবহাওয়া ও প্রচণ্ড ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও খেটেখাওয়া মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। আর জীবিকার তাগিদে যারা বাইরে বের হচ্ছেন, তাদের পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন কষ্ট। মাঠে কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শীতবস্ত্রের অভাবে শীতার্ত দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ চরম দুর্ভোগে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। ঠান্ডাজনিত রোগ যেমন ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কনকনে শীতে প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে চাইছেন না। দোকানপাট খুলছে দেরিতে, রাস্তাঘাট ও বাজারগুলোতেও স্বাভাবিক দিনের তুলনায় লোকসমাগম অনেক কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল বুধবার দেশের চার বিভাগ এবং আরও ৯ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে শৈত্যপ্রবাহ। চলতি মৌসুমে এত বড় এলাকাজুড়ে এর আগে শৈত্যপ্রবাহ দেখা যায়নি। গতকাল রাজধানীতেও তাপমাত্রা আগের দিনের চেয়ে একলাফে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে আসে। তবে এদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কুয়াশার সেই দাপট ছিল না। আকাশ পরিষ্কার থাকার কারণেই মূলত তাপমাত্রার এই নিম্ন্নগতি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
টানা তিন দিন দেশের সর্বনিম্ন্ন তাপমাত্রা নিম্ন্নমুখী। গত সোমবার দেশের সর্বনিম্ন্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল তা নেমে হয় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল উত্তরের জেলা রাজশাহীতে। আজ সেই উত্তরের জনপদ নওগাঁর বদলগাছীতে তাপমাত্রা কমে হেয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা জানান এদিন বদলগাছীতে যে তাপমাত্রা হয়েছে, তা এ মৌসুমের সর্বনিম্ন্ন। তাপমাত্রা আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আরও কমতে পারে। রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সর্বত্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র। এই চার বিভাগে জেলার সংখ্যা ৩২। এর পাশাপাশি টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ মোট ৯ জেলায় বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। যখন কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তখন তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলে। তাপমাত্রা ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তাকে বলা হয় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলে গণ্য করা হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
চুয়ডাঙ্গায় ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস
আমাদের চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গায় প্রতিদিন দেড় থেকে দুই ডিগ্রি তাপমাত্রা হ্রাস পাচ্ছে। এ জেলায় ১ দিনের ব্যবধানে আবারো মাঝারি শৈত্য প্রবাহ শুরু হয়েছে। এ কারণে জনজীবনে অস্বস্তি অবস্থা বিরাজ করছে। কুয়াশা না থাকলেও রয়েছে শীতের তীব্রতা।
চুয়াডাঙ্গাস্থ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, গতকাল বুধবার সকাল ৯ টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ। চলতি বছর আপাততঃ এটা চুয়াডাঙ্গার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এদিন সকাল ৬টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এসময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ।
তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। ঠান্ডা বাতাস, রাত থেকে পড়া ঘনকুয়াশা আর মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে চুয়াডাঙ্গায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। ভোর থেকেই শহরের বিভিন্ন মোড়, বাসস্ট্যান্ড ও চায়ের দোকানের সামনে নিম্ন আয়ের মানুষদের জড়ো হতে দেখা গেছে। আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করার চেষ্টা করছেন তারা। অনেকের ভাষায়, প্রচন্ড শীতের কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষক ও দিনমুজুররা জানান, ভোরে কাজের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হলেই হাত-পা অবশ হয়ে আসে। মনে হয় যেন বরফের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজে বের হতে হয়। অনেক সময় কাজ না পেয়ে শীতের মধ্যে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
তীব্র শীতের প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য খাতেও। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
শীতের কষ্টে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরাও। ভোরে প্রাইভেট পড়তে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের কারণে যানবাহনে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে হেঁটে যাতায়াত করছে। এক শিক্ষার্থী বলেন, আগে ভ্যান বা ইজিবাইকে যেতাম। এখন শীতের কারণে সেগুলোতে ওঠা যায় না। হেঁটেই যেতে হচ্ছে। হাত-পা খুব ঠান্ডা হয়ে যায়, তবে হাঁটলে শরীর কিছুটা গরম হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে।
একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, বেলা ১১টার আগে খুব বেশি ক্রেতা বা গ্রাহকের দেখা মিলছে না। শীতের প্রভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও লেনদেন স্বাভাবিকের তুলনায় কমেছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জামিনুর রহমান জানান, জেলার ওপর দিয়ে আগামী ১১ অথবা ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে।