‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা বললেও বাস্তবে তা নাগরিকের বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধ্যাদেশের ধারা ও কাঠামো সরকারি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্রীভূত করছে, স্বার্থের দ্বন্দ্বের সুযোগ বাড়াচ্ছে এবং সাইবার স্পেসে সরকারের ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। একইসঙ্গে অধ্যাদেশটি রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো দিকনির্দেশনা না দিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও স্বার্থের দ্বন্দ্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। গতকাল রাজধানীতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, নতুন সাইবার অধ্যাদেশের ধারা ২৬(১) ও (২)-এ সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত বিষয়ে সহিংসতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, এই ধারাগুলোর অস্পষ্ট ভাষা জেল ও জরিমানার বিধান ইচ্ছামতো প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, আইনের অস্পষ্টতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের খামখেয়ালি প্রয়োগকে উৎসাহিত করে, যা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের বাকস্বাধীনতাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, ধারা ৫ অনুযায়ী, গঠিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। টিআইবির মতে, কনটেন্ট ব্লকিংয়ের মতো সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কাঠামোর অধীনে না রেখে সরাসরি সরকারের হাতে রাখলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠবে। এতে রাজনৈতিক সুবিধা বা অস্বস্তিকর তথ্য গোপনের হাতিয়ার হিসেবে এই ক্ষমতা ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাদেশের ধারা ১২ অনুযায়ী, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠিত হবে সরকার প্রধানের নেতৃত্বে। ২৫ সদস্যের এই কাউন্সিলে মাত্র দুজন আইসিটি বা মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ থাকার কথা বলা হয়েছে, তাও সরকার মনোনীত। টিআইবির মতে, এতে সরকারের বাইরে প্রকৃত অংশীজন, নাগরিক সমাজ কিংবা প্রযুক্তি খাতের স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব কার্যত অনুপস্থিত থেকে যাবে।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষায়, এই কাঠামো সাইবার স্পেসে সরকারের ক্ষমতাকেই আরও কেন্দ্রীভূত করবে এবং পুরো জাতিকে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিতে ফেলবে।
‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ডেটা প্রোটেকশন নীতিমালা– যেমন আইনসম্মততা, মানবাধিকার প্রাধান্য, স্বচ্ছতা, উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধতা, তথ্য ন্যূনতমীকরণ ও জবাবদিহি এই অধ্যাদেশে উপেক্ষিত হয়েছে।
বিশেষ করে ধারা ১৫(৪)-এ ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যয় বা প্রচেষ্টা’র অজুহাতে উপাত্ত-জিম্মাদার ও প্রক্রিয়াকারীকে তাদের দায়িত্ব থেকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের হাতে থাকায় অপব্যবহারের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
ধারা ২৪-এ অপরাধ প্রতিরোধের নামে ব্যক্তিগত উপাত্তে ব্যাপক প্রবেশাধিকারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ও সীমারেখার অনুপস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা বা জনগণের স্বার্থরক্ষার অজুহাতে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি। সংগঠনটির মতে, উপাত্ত সুরক্ষার নামে এমন বিধান আসলে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে টিআইবি মনে করে, সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দমনমূলক আইন নয়, বরং মানবাধিকারভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো প্রয়োজন। অধ্যাদেশ দুটি চূড়ান্ত করার আগে সব অংশীজনের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা এবং বিতর্কিত ধারাগুলোর মৌলিক সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।