যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানোর ফলে দুঃশ্চিন্তা থেকে সরে এসেছে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্প। এছাড়া বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার (পাদুকা) খাত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন সুযোগ দেখতে পাচ্ছে। কারণ, প্রতিযোগী দেশ চীন ও ভারতের ওপর তুলনামূলক উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে জানান রপ্তানিকারকরা ।
সরকারের একান্ত চেষ্টা ও আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার রপ্তানি পণ্যের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে। অন্যদিকে, ভারত ও চীনের ওপর এখনও যথাক্রমে প্রায় ৫০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ চড়া শুল্ক বলবত রয়েছে।
চামড়া খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শুল্ক সুবিধার কারণে ইতিমধ্যে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাড়তি অর্ডার পেতে শুরু করেছে।তবে তারা সতর্ক করে এ-ও বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ, অবকাঠামো ও ইউটিলিটি সরবরাহে নানা সমস্যা রয়েছে। এসব দুর্বলতার ফলে এই সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া ও ফুটওয়্যার রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ১.৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪.৪৫ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে এসেছে ৩৯৭.৫ মিলিয়ন ডলার, যা এই খাতের মোট রপ্তানির প্রায় ২০-২৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত স্থানীয় বাজারে ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বর্তমানে দেশের এ খাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর চামড়া প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত আছে ২৫০টির বেশি ট্যানারি। চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯০টির মতো। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮–১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে ।
লেদারেক্স ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতির ফলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে চলে আসবে, যা বিনিয়োগ তৈরি টানবে।
‘তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারের নীতি সহায়তা প্রয়োজন। বাড়তি চাহিদা পেলে তা নেওয়ার সক্ষমতা দেশের চামড়া শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের রয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে বেশ ওঠানামা দেখা গেছে। অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশটিতে রপ্তানি যথাক্রমে ৬৪ শতাংশ ও ৪৯ শতাংশ বাড়লেও পরবর্তী দুই বছরে তা যথাক্রমে ২২ শতাংশ ও ২০ শতাংশ কমে যায়।
নাজমুল হাসান দীর্ঘমেয়াদী বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বেশ কিছু বাধার কথা তুলে ধরেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো অনির্ভরযোগ্য ইউটিলিটি।
‘বাংলাদেশে নতুন কারখানা স্থাপনে বড় সংকট হচ্ছে ইউটিলিটি। গ্যাস-বিদ্যুতের যথাযথ জোগান দেওয়া সম্ভব হয় না। বিদ্যুৎ কখনও থাকে, আবার থাকে না। গ্যাসেরও পর্যাপ্ত জোগান নেই। ফলে দেশের সব শিল্প খাতই ইউটিলিটি সমস্যায় ভুগছে,’ বলেন তিনি।
নাজমুল যোগাযোগ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করে বলেন, ‘কোনো বিদেশি উদ্যোক্তা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সফর করতে চাইলে যোগাযোগ ব্যবস্থাÍযানজট ও রাস্তারÍ চিত্র দেখে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সফর করে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ করেন না কিংবা বিনিয়োগ করবে না বলে জানিয়ে দেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে, বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে।’
দেশের প্রথম সারির জুতা উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাও মনে করেন বিদেশী বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এই সক্ষমতার উন্নতি কিংবা বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতি তৈরী করতে না পারলে প্রতিযোগী দেশসমূহে বিনিয়োগ চলে যাবে।
অন্যান্য রপ্তানিকারকরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান পরিবেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে অনাগ্রহী।
দেশের প্রথম সারির জুতা উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এই সক্ষমতার উন্নতি কিংবা বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারলে প্রতিযোগী দেশগুলোতে বিনিয়োগ চলে যেতে পারে।তবে কিছু রপ্তানিকারক এর মধ্যেই সুবিধা পেতে শুরু করেছেন।
ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসানুজ্জামান বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির ফলে বাংলাদেশের জুতা শিল্পের জন্য সুবিধা-অসুবিধা দুটোই হয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় চীন ও ভারতের শুল্ক হার বেশি হওয়ায় ওই দুই দেশ থেকে বাংলাদেশে অর্ডার শিফট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড চীন থেকে এ ধরনের কিছু অর্ডার পেয়েছে; আগামীতে আরও অর্ডার পাইপলাইনে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘মার্কিন শুল্ক নীতির সুফল কাজে লাগাতে হলে সরকারি সেবা সংস্থাগুলো, বিশেষ করে কাস্টমসকে আরও বেশি আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে অর্ডার হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু নানা জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেলিভারি দিতে না পারলে বিপুল লোকসান গুনতে হবে।’
সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে এমন আরও অন্তত পাঁচটি কোম্পানির কর্মকর্তারাও টিবিএসকে জানান, শুল্ক পরিবর্তনের কারণে তারা চাহিদা বাড়ার আশা করছেন।
নারীদের জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আকিজ ফুটওয়্যার লিমিটেড জানায়, গত বছর তাদের ১০০ কোটি টাকা টার্নওভারের প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
নাম না প্রকাশের শর্তে কোম্পানিটির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের আগের কিছু অর্ডার আঁটকে ছিল, তা ডেলিভারি করা হয়েছে। নতুন নতুন অর্ডারও পাচ্ছি আমরা।