- ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার ভূপাতিত হয়ে ৬ ক্রু নিহত
- মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা আত্মগোপনে
- বিস্ফোরণে কাঁপলো দুবাই
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। হোয়াইট হাউসের ভেতরে চলা এক জটিল রেষারেষি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রভাব ফেলছে। ফিলিস্তিনীদের সমর্থনে গতকাল শুক্রবার আয়োজিত বার্ষিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ‘আল-কুদস’ উপলক্ষে ইরানের ছোট বড় সব শহরে বিশাল জনসমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। এদিকে পশ্চিম ইরাকের আকাশসীমায় একটি মার্কিন কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকারকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৬ ক্রুর সবাই হিনত হয়েছে। অপরদিকে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলায় তারা আত্মগোপনে যাচ্ছে। এদিকে আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা আবাসিক এলাকায় অবস্থান নেয়ায় মার্কিন সেনাদের তথ্য জানতে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রয়টার্স, এপি, এএফপি, সিএনএন, তাসনিম নিউজ, মিডল ইস্ট আই, এনডিটিভি।
ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন
হোয়াইট হাউসের ভেতরে চলা এক জটিল রেষারেষি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লেও উপদেষ্টারা এখন বিতর্কে জড়িয়েছেন, কখন ও কীভাবে এই যুদ্ধে ‘বিজয়’ ঘোষণা করা উচিত।
ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, কিছু কর্মকর্তা সতর্ক করছেন, ইরানের ওপর মার্কিন হামলার ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে ট্রাম্পকে চড়া রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা চাচ্ছেন এই হামলা অব্যাহত থাকুক। এই পর্যবেক্ষণ হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন এক চিত্র তুলে ধরেছে, যা আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান।
পরিবর্তনশীল বার্তা ও অভ্যন্তরীণ নানা মত
গত বছর ক্ষমতায় ফেরার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি কোনো ‘বোকাটে’ সামরিক অভিযানে জড়াবেন না। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধ বিশ্ববাজার ও আন্তর্জাতিক তেলের বাণিজ্যকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পর্দার আড়ালের এই দলাদলি ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বড় বড় লক্ষ্যের কথা বললেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি জোর দিয়ে বলছেন, এটি একটি সীমিত অভিযান। এর লক্ষ্যগুলো মূলত অর্জিত হয়েছে। তবে এই অস্পষ্ট বার্তার কারণে তেলের বাজার বারবার ওঠানামা করছে।
গত বুধবার কেন্টাকিতে এক সভায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জিতেছি।’ আবার পরক্ষণেই সুর পাল্টে তিনি বলেন, ‘আমরা তো জলদি চলে আসতে চাই না, তাই না? আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।’ সূত্রমতে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন, তেলের দাম বেড়ে গেলে যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে কট্টরপন্থী লিন্ডসে গ্রাহাম ও টম কটনের মতো রিপাবলিকান সিনেটর এবং মার্ক লেভিনের মতো সংবাদ ভাষ্যকাররা ট্রাম্পকে সামরিক চাপ বজায় রাখতে উৎসাহ দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে আটকাতে হবে ও মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার কড়া জবাব দিতে হবে। তৃতীয় আরেকটি পক্ষ আসছে ট্রাম্পের জনতুষ্টিবাদী সমর্থকদের কাছ থেকে। স্টিভ ব্যানন ও টাকার কার্লসনের মতো ব্যক্তিরা তাকে পরামর্শ দিচ্ছেন, যেন তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে আটকে না পড়েন। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) কট্টরপন্থীদের বিশ্বাস করাচ্ছেন, অভিযান চলবে। বাজারকে বিশ্বাস করাচ্ছেন, যুদ্ধ জলদি শেষ হবে। আর নিজের সমর্থকদের বোঝাচ্ছেন, উত্তেজনা বাড়বে না।’ হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট এক বিবৃতিতে এই প্রতিবেদনটিকে ‘গুজব ও অনুমান’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সবার কথা শোনেন ঠিকই। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত তিনিই নেন।’
ইরাকে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত, ৬ জনের সবাই নিহত
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে বিধ্বস্ত হওয়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি রিফুয়েলিং বা জ্বালানিবাহী উড়োজাহাজের সকল ক্রু সদস্যের মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনার শিকার হওয়া এই উড়োজাহাজটিতে মোট ছয়জন ক্রু ছিলেন, যাদের সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রাথমিক তথ্যে চারজন ক্রু সদস্যের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া এক বার্তায় সেন্টকম জানিয়েছে, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে ভেঙে পড়া মার্কিন কেসি-১৩৫ মডেলের জ্বালানিবাহী বিমানটির নিখোঁজ থাকা বাকি ক্রুদের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত শোকের ছায়াই নেমে এসেছে। উদ্ধার অভিযান শেষে ছয়জন ক্রু সদস্যেরই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিমানটি কী কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে তা নিয়ে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো কারণ উল্লেখ করেনি। তবে বর্তমান উত্তপ্ত সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে এই দুর্ঘটনা মার্কিন বাহিনীর জন্য এক বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কুদস দিবসের মিছিলে ইরানে লাখো মানুষ ৪ মার্কিন সেনা নিহত
ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে গতকাল শুক্রবার আয়োজিত বার্ষিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ‘আল কুদস দিবস’ উপলক্ষে ইরানের ছোট-বড় সব শহরে বিশাল জনসমাবেশ ও মিছিল হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানসহ খোররামাবাদ, ইসফাহান, গোলেস্তান, ইয়াজদ, মাশহাদ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাহেদান শহরে লাখো মানুষ পতাকা হাতে মিছিলে অংশ নিয়েছেন।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ও তার নিহত বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি দেখা গেছে।
এমন এক সময়ে এ বিশাল গণমিছিল অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তেহরানে ‘বড় ধরনের হামলার’ ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তেহরান, ইসফাহানসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছিল।
ইরানের হামলায় ঘাঁটি ছেড়ে কোথায় লুকাচ্ছে হাজারো মার্কিন সেনা
কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলা চলছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সামরিক ঘাঁটি খালি করে কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে।
এর ফলে মার্কিন সেনাদের জন্য আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় হোটেল ও ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপনে থাকছেন তারা।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজের বরাতে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, আবাসিক এলাকায় অবস্থান নেওয়া মার্কিন সেনাদের তথ্য জানাতে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা।
আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, হাজার হাজার মার্কিন সেনা হোটেল ও ব্যক্তিগত আবাসনে অবস্থান করছে। ওয়াশিংটন তাদের আরব ভাইদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে বলেও দাবি করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমেরিকানদের শনাক্ত করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। তাই হোটেলগুলোতে তাদের আশ্রয় না দেওয়া এবং তাদের অবস্থান থেকে অন্যদের দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। আত্মগোপনে থাকা মার্কিন সেনাদের অবস্থান জানাতে জনগণকে টেলিগ্রামের মাধ্যমে তথ্য পাঠানোর আহ্বানও জানানো হয়।
এদিকে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে হামলায় ফ্রান্সের একজন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ইরবিল অঞ্চলে ফরাসি বাহিনীর ওপর হামলা অগ্রহণযোগ্য। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
এর আগে ফ্রান্সের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, ওই অঞ্চলে ইরাকি অংশীদারদের সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণে থাকা ছয় ফরাসি সেনা ড্রোন হামলায় আহত হয়েছেন।
কাঁপলো দুবাই
দুবাই শহরের কেন্দ্রীয় অংশে জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
বার্তা সংস্থাটি জানায়, গতকাল শুক্রবার বিস্ফোরণের পর বেশ কিছু ভবন কেঁপে ওঠে এবং আকাশে ঘন ধোঁয়া দেখা যায়।
বার্তা সংস্থা এএফপির একজন প্রতিবেদক বলেছেন, তিনি একটি বিশাল জোড়া বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন, যার ফলে আশপাশের ভবনগুলো কেঁপে ওঠে।
দুবাই মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ধ্বংসাবশেষের কারণে একটি ভবনের বাইরের অংশে ‘সামান্য ঘটনা” ঘটেছে।
এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলেও নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ জায়েদ রোড-এর দিক থেকে সাইরেনের শব্দ শোনা যায়।
ঘটনার পর এলাকাটি ঘিরে ফেলেছে দুবাই পুলিশ। ভবনটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে জানা গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল সেন্টার (ডিআইএফসি) এলাকায়।
কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার ভয়াবহতা চেপে গেছে যুক্তরাষ্ট্র
কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কৌশলগত অপারেশন সেন্টারে চলতি মাসের শুরুতে চালানো ইরানি ড্রোন হামলার ভয়াবহতা প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতির যে পরিমাণ পেন্টাগন আগে প্রকাশ করেছিল, প্রকৃত চিত্র তার চেয়েও অনেক বেশি বিধ্বংসী।
গত ১ মার্চের ওই হামলার পর প্রাথমিক প্রতিবেদনে সামান্য ক্ষয়ক্ষতির কথা জানানো হলেও, সিবিএস নিউজ একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, কুয়েত সিটির শুয়াইবা বন্দরের ওই কেন্দ্রে তখন এক বিপর্যয়কর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
সিবিএস-এর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওই হামলায় ৬ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন আরও ৬০ জনের বেশি সেনাসদস্য। এ সংখ্যা পেন্টাগনের দেওয়া আগের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। আহতদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক; কেউ মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছেন, কারও শরীরে বিদ্ধ হয়েছে কামিকাজে ড্রোনের স্প্লিন্টার, আবার অনেকে মস্তিস্কে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ থাকা দুই সেনাসদস্যের মরদেহ পরে উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ৩০ জনের বেশি সেনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা প্রায় ২০ জনকে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বিমানযোগে কুয়েত থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাদের অনেকেরই স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া এবং কনকাশনের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের তৈরি শাহেদ সিরিজের একটি কামিকাজে ড্রোন রাডার ফাঁকি দিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক সেন্টারে আঘাত হানে। নব্বইয়ের দশক থেকেই শুয়াইবা বন্দরটি মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি কৌশলগত হাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে বর্তমান সংঘাত শুরুর পর থেকেই সেখানে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা গেছে। গত ১ মার্চ এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় কুয়েতি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভুলবশত যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। যদিও সেসব বিমানের পাইলট ও ক্রুদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান অপারেশন এপিক ফিউরির পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ এখনও বিস্তারিত জানায়নি পেন্টাগন। তবে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং প্রায় ১৪০ জন আহত হয়েছেন।
অভিযান জোরালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, আগামী আরও মার্কিনির প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কাসেম সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তুলনা করা হচ্ছে। সে সময় ১০০ জনেরও বেশি মার্কিন সেনার মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছিল। তৎকালীন মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেছিলেন, আমি শুনেছি তাদের মাথাব্যথা এবং আরও কিছু সমস্যা হয়েছে, কিন্তু আমি বলতে পারি এটি খুব একটা গুরুতর নয়।
ইরাকে হামলায় ফরাসি সেনা নিহত
ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান অঞ্চলে এক হামলায় ফ্রান্সের এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন ফরাসি সেনা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
ম্যাক্রোঁ জানান, নিহত সেনাসদস্যের নাম আর্নল্ড ফ্রিয়ন। তিনি চিফ ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে ইরবিল অঞ্চলে দায়িত্বরত ছিলেন। এই হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে ম্যাক্রোঁ বলেন, আর্নল্ড ফ্রান্সের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। ইরাকে আমাদের অবস্থান ছিল কঠোরভাবে সন্ত্রাসবাদ দমনের লক্ষে। ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ এই ধরনের হামলাকে বৈধতা দিতে পারে না।
বাগদাদ থেকে আল-জাজিরার প্রতিনিধি মাহমুদ আবদেলওয়াহেদ জানিয়েছেন, ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরাক এখন ‘দ্বিতীয় যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হয়েছে। ইরবিল ও বাগদাদের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও কনসুলেট লক্ষ্য করে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইরাকের ইরান-পন্থি গোষ্ঠী আসহাব আহল আল-কাহফ শুক্রবার এক বিবৃতিতে হুমকি দিয়েছে যে, ইরাক ও এই অঞ্চলে অবস্থিত ফরাসি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সব স্থাপনা এখন থেকে তাদের লক্ষ্যবস্তু হবে। এর আগে গত বুধবার ইরাকের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয় ফরাসি সেনা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্টের উল্লিখিত আহত সেনারা তারাই কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালির সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, ইরবিলে অবস্থিত তাদের একটি ঘাঁটিতে গত রাতে বিমান হামলা হয়েছে। ওই ঘাঁটিতে ন্যাটোর কর্মীরা অবস্থান করেন। তবে এএফপির তথ্যমতে, ইতালির কোনও সেনাসদস্য এই হামলায় আহত হননি।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তৃতি রোধে ফ্রান্স তাদের সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জানান, ফ্রান্সের রণতরি শার্ল দ্য গল-কে ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা হবে। এ ছাড়া সাইপ্রাসে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফরাসি সরকার।