হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নানারকম বক্তব্য দিচ্ছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। কেউ বলছেন, তিনি খুবই ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছেন। আবার কেউ বলছেন, তার অবস্থা স্বাভাবিক। তিনি কথা বলছেন। নেতাদের এমন বক্তব্যে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন মিডিয়া কর্মীসহ নেতাকর্মীরা। তবে মেডিকেল টিমের সদস্যরা বলেছেন, খালেদা জিয়ার অবস্থা আগের মতোই রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে শয্যাশায়ী খালেদা জিয়া। তার লিভারজনিত সংকট, কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাস, শ্বাসকষ্টসহ একাধিক শারীরিক জটিলতা একসঙ্গে দেখা দিয়েছে।

২৩ নভেম্বর রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তার ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান বলেছেন, খালেদা জিয়া ‘খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে’ চলে গেছেন। রোববার রাত থেকে খালেদা জিয়া এ অবস্থায় গেছেন বলে তিনি জানান। গতকাল সোমবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ব্রিফিং করে আহমেদ আজম খান এ কথা জানান।

তিনি বলেন, রোববার রাত থেকে ম্যাডাম খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে চলে গেছেন। ফাইট করছেন আমাদের মাঝে ফিরে আসার জন্য। এখনো অবস্থা ক্রিটিক্যাল আছে। বলার মতো কোনো কন্ডিশনে এখনো তিনি আসেননি। সারা জাতির কাছে দোয়া চাওয়া ছাড়া আর কিছু বলার নেই। এই বিএনপি নেতা আরও বলেন, বর্তমানে খালেদা জিয়া ভেন্টিলেশন সাপোর্টে আছেন। সিসিইউ থেকে আইসিইউ, এরপরে ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট, যা-ই বলেন। আমি এগুলোর বাইরে বলব যে ম্যাডাম খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছেন। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের চিকিৎসকেরা যুক্ত ছিলেন। এখন চীনের চিকিৎসকেরাও যুক্ত হয়েছেন বলে জানান আজম খান। তিনি বলেন, সবাই মিলে ক্লান্তিহীনভাবে চেষ্টা করছেন। বাদবাকি আল্লাহ ভরসা।

এদিকে খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল গণমাধ্যমের কাছে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, ম্যাডামের অবস্থা স্থিতিশীল আছে। ডাক্তারদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিসা চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ম্যাডামকে নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, এটা সঠিক নয়। কেউ এতে, বিভ্রান্ত হবেন না। একই সঙ্গে দলের চেয়ারপার্সনের আশু আরোগ্য কামনায় মহান রাব্বুল আ‘লীমনের কাছে দোয়া করতে দলের নেতা-কর্মী ও দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ করেন।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এভারকেয়ার হাসপাতালের ইন্টিনসিভ কেয়ার ইউনিটে আগের মতোই ম্যাডামের চিকিসা চলছে। দয়া করে যে যাই বলুক এ ব্যাপারে কারো কথা কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিসকরা সার্বক্ষণিক ম্যাডামের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত আছেন। তাদের থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি, তার চিকিৎসা চলছে, এটাই আপডেট। আপনারা সবাই দোয়া করুন, আল্লাহ যেন তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেন সুস্থভাবে।

মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে গণমাধ্যমকে যথাসময়ে অবহিত করা হবে।

এদিকে গতকাল সোমবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা খালেদা জিয়ার সবশেষ খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে যান। সেখানে তারা ডাক্তারদের সাথে কথা বলেন।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান তিনি। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান। সেক্রেটারি জেনারেলকে স্বাগত জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন।

এ ছাড়া, সেখানে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনা।

সেক্রেটারি জেনারেল বিএনপি চেয়ারপার্সনের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং মহান আল্লাহর কাছে তার পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য দোয়া করেন।

জোনায়েদ সাকি গতকাল দুপুরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে যান। পরে বেলা আড়াইটার দিকে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, গত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে খালেদা জিয়া যেভাবে মানুষের আশা-ভরসার কেন্দ্র হিসেবে ছিলেন, তাতে তিনি একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে তিনি এখন কেন্দ্রীয় জায়গায় আছেন। চিকিৎসকরা তাকে বলেছেন, এখন খালেদা জিয়ার ডায়ালাইসিস চলছে। তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

রোববার দিবাগত রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার খোঁজ-খবর নিতে যান গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়াকে মহান আল্লাহ সেই পর্যন্ত দীর্ঘায়ু দান করুন, যতদিন শেখ হাসিনার ফাঁসি কার্যকর না হয়। তার শারীরিক অবস্থার অবনতির জন্য দায়ী একমাত্র শেখ হাসিনা সরকার। এই মানুষটি শেখ হাসিনার দ্বারা ব্যাপকভাবে নিপীড়িত হয়েছেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় সহায়তা করতে পাঁচ সদস্যের একটি বিদেশি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম এভারকেয়ার হাসপাতালে এসেছে। হাসপাতাল সূত্রমতে, সোমবার দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে মেডিকেল টিম হাসপাতালের প্রধান ভবনে প্রবেশ করে। এর পরপরই তারা খালেদা জিয়ার চিকিৎসা তদারকিতে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া মেডিক্যাল টিমের সদস্যদের সাথেও কথা বলেন।

মেডিকেল বোর্ড জানায়, খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়তি বিশেষজ্ঞ মতামত অত্যন্ত প্রয়োজন। সূত্র আরও জানিয়েছে, এই বিদেশি চিকিৎসকদের বেশিরভাগই চীনা নাগরিক।

এর আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, দেশী ও বিদেশী চিকিৎসকদের সমন্বয়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। আমাদের চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

৭৯ বছর বয়সি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগী, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে ১৫ অক্টোবর তিনি এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। একদিন থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান তিনি। সেখানে ১১৭ দিন অবস্থান শেষে ৬ মে দেশে ফেরার পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান।