বিদায়ী বছর ২০২৫ এ বাংলাদেশের বিচার বিভাগে ছিল সারাবিশ্বের চোখ। বিশেষত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদ-, গুমের মামলায় সেনা সদস্যদের বিচার, আপিল বিভাগের রায়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকারকে বৈধতা দেওয়া, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসা, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পাওয়া, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ড. জুবাইদা রহমান, জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে মামলা থেকে খালাসসহ সর্বশেষ প্রধান বিচারপতির অবসর ও নতুন প্রধান বিচারপতিকে গ্রহণের মাধ্যমে আলোচিত একটি বছর শেষ করল বিচারাঙ্গন।
শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় : জুলাই গণহত্যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল শেখ হাসিনার বিচার। সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে গত ১৭ নবেম্বর ২০২৫ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদ- দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনটি পৃথক অপরাধে তাকে এই দ- দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও দুইটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
এ ছাড়া, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদ- দেন ট্রাইব্যুনাল। আর সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।
সাবেক আইজিপির ব্যাপারে আদালত বলেন, তার অপরাধও মৃত্যুদ-যোগ্য। তবে তিনি বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করায় এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় সব অভিযোগে তাকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, ষড়যন্ত্র, উসকানি ও ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের অভিযোগে বিচার হয়েছে।
গুমের মামলায় সেনা সদস্যদের ট্রাইব্যুনালে বিচার: বিদায়ী বছরে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল গুমের ঘটনায় দুটি মামলার বিচার। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বিগত পনের বছরে বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামীর বিচার শুরু করা। টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় প্রথম এসব আসামীর ট্রাইব্যুনালে হাজির করা নিয়ে ছিল একটি অনিশ্চয়তা। কঠোর নিরাপত্তা ও বিচারকে এগিয়ে নিতে অনেক ধরনের আলোচনা শোনা গেলেও ট্রাইব্যুনাল আসামীদের আদালতে হাজির করার নির্দেশনা দেন। সর্বশেষ ২৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। এই মামলায় সূচনা বক্তব্যের জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি ধার্য করা হয়েছে।
এ ছাড়া গুমের অপর একটি মামলায় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় ১৩ জনকে আসামী করা হয়। এ মামলায়ও শেখ হাসিনা-তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নাম রয়েছে। এ মামলাটিরও অভিযোগ গঠন করে বিচার চলমান রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়: ২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার ১৮ বছর পর পৃথক সচিবালয় গঠন করল বিচার বিভাগ। পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করেছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। গত ১১ ডিসেম্বর বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
ফিরলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার: নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহালের রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, তার পরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে রায় ঘোষণার নির্ধারিত দিনে ২০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। ১৪ বছর আগে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হয়েছে।
জামায়াত নেতা এটিএম আজহার খালাস: বছরের আলোচিত ইস্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদ-াদেশ থেকে খালাস পাওয়া। আজহারুলের করা আপিল ২৭ মে সর্বসম্মতিতে মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন। এই মামলায় আজহারুলকে মৃত্যুদ- দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় এবং মৃত্যুদ- বহাল রেখে এর আগে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য কোনো মামলা না থাকলে আজহারুলকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় রিভিউ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিলে এই প্রথম কেউ খালাস পেলেন। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজহারুলকে মৃত্যুদ- দিয়ে রায় দেন। দ-াদেশের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি আপিল করেন আজহারুল ইসলাম। এই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর আপিল বিভাগ রায় দেন। ২০২০ সালের ১৫ মার্চ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে ২০২০ সালের ১৯ জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করেন আজহারুল ইসলাম। এই পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি লিভ মঞ্জুর করে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। পাশাপাশি দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিলের সংক্ষিপ্তসার জমা দিতে বলা হয়। শুনানি শেষে রায় দেন আপিল বিভাগ। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট মগবাজারের বাসা থেকে আজহারুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
জামায়াতের নিবন্ধন ও ইসিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ: রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর নিবন্ধন ফেরত চেয়ে আপিল করে জামায়াত। দীর্ঘদিন শুনানি শেষে নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে বাতিল হওয়া নিবন্ধন ও অন্যান্য বিষয়ে দলটির করা আবেদন নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া সর্বোচ্চ আদালত বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ‘পেন্ডিং রেজিস্ট্রেশন’ ও অন্যান্য বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অন্যদিকে, দলীয় প্রতীক সংক্রান্ত জামায়াতের আবেদন প্রত্যাহারের আবেদন কোনো পর্যবেক্ষণ না দিয়ে মঞ্জুর করেন সর্বোচ্চ আদালত।
অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ বৈধ : ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর ৮ আগস্ট শান্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠন করেন। কিন্তু হাইকোর্টের এক আইনজীবীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে তার শপথ গ্রহণ বৈধ বলে হাইকোর্ট রায় দেয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ আপিল শুনানি শেষে গত ৪ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল খারিজ করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠনকে বৈধতা দেয়।
২১ গ্রেনেড মামলায় তারেক রহমান, দুই মামলায় খালেদা জিয়ার খালাস: জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাত বছরের কারাদ- ও ১০ লাখ টাকা অর্থদ- থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া খালাসের রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা পৃথক তিনটি লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) খারিজ করে ৩ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামীকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানি শেষে ৪ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ সংক্রান্ত রায় দেন।
১০ বছরের সাজা থেকে খালাস পান তারেক : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ১০ বছরের সাজা থেকে খালাস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে বিচারিক আদালতের সাজাও বাতিল করা হয়েছে। তিনজনের করা আপিল গ্রহণ করে ১৫ জানুয়ারি এ রায় দেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ। রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ছেলে তারেক রহমানসহ সবাই খালাস পেয়েছেন।
নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ
দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২৮ ডিসেম্বর শপথ নেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে এই শপথ বাক্য পড়ান। সংবিধান অনুযায়ী, বিদায়ী বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে গেছেন। ওইদিন তার ৬৭ বছর পূর্ণ হয়।
আলোচনায় হাদি হত্যার আসামীর জামিন: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। তিনি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে প্রচারে নেমেছিলেন। ১২ ডিসেম্বর তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদের চোখে তিনি এক লড়াকু যোদ্ধা। তার গুলির পর আলোচনায় আসে তাকে হত্যাকারী শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওরফে রাহুল। তিনি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ছিলেন। গত বছরের ১ নভেম্বর পিস্তল-গুলিসহ ফয়সালকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি ডাকাতি ও অস্ত্র মামলায় তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন। তাকে জামিন করানোর ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এক আইনজীবীর নামে আসে। এতে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।