চলতি সপ্তাহেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এরই মধ্যে নির্বাচন পেছানোর জন্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে ম্যাসেজ আসছে বলে খবর প্রচার হচ্ছে। এছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও বলছেন, নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোট কি পেছানো হচ্ছে? এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সব মহলে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
জানা গেছে, নির্বাচন পেছানোর বিষয়টি ঘিরে গত কয়েকমাস বিভিন্ন মহলে আলোচনা থাকলেও এটি মূলত সামনে আসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের এক মন্তব্য থেকে। গত ৪ ডিসেম্বর বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, অনিবার্য কোনো কারণ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত হোক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তা চায় না। খালেদা জিয়া অসুস্থ, এই প্রেক্ষাপটে তফসিল পেছানোর কোনো আবেদন করা হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, অনিবার্য কারণ ছাড়া নির্বাচন বিলম্বিত হোক বিএনপি তা চায় না। তিনি খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বলেছেন, বেগম জিয়া অসুস্থ। তার জন্য দোয়া করছি। আল্লাহর মেহেরবানিতে তার চিকিৎসা চলছে। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন এটা বিবেচনায় নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছেন, অনিবার্য কারণ ছাড়া বিএনপি নির্বাচন বিলম্ব চায় না। খালেদা জিয়া দ্রুত সুস্থ হয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন। যথাসময়ে নির্বাচন হোক এটা আমাদের চাওয়া।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এই বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচন সংক্রান্ত দলের অবস্থান এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজনীতিতে যখন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ চলছে এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে, তখন বিএনপির পক্ষ থেকে যথাসময়ে নির্বাচনের পক্ষে এমন অবস্থান নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল। অনেকেই বলছেন, বেগম জিয়ার শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি সামনে রেখে হয়ত বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় পেছানোর কথা বলা হতে পারে। যদিও বিএনপি এ বিষয়ে এখনো কিছুই বলেনি।
এদিকে নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, যারা ডিসেম্বরে নির্বাচন চেয়েছিল বা বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের দাবি করেছে তাদের অনেকেই আবার এখন নির্বাচন চাচ্ছে না কিংবা নির্বাচন পেছানোর নানা ষড়যন্ত্রে জড়িত হচ্ছে। উপদেষ্টা বলেন, এটা কেন হচ্ছে তাও খুব স্পষ্ট। আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে এনে ইনক্লুসিভ ইলেকশন করার পরিকল্পনা তাদের মাথায় ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেখানে ফ্যাসিবাদীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে না বলে তাদের এখন মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। এ ধরনের নানা ষড়যন্ত্র কিংবা পরিকল্পনা আছে। তিনি আরও বলেন, অনেকেই নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবে। তবে আমরা মনে করি যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী, রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সিভিল সোসাইটি, সবার সহযোগিতায় এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এবার একটা সুষ্ঠু ও সুন্দর আয়োজন আমরা করতে পারব।
ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই জাতীয় নির্বাচন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। তাদের দাবি, সময়ক্ষেপণ বা অনিশ্চয়তা তৈরির যেকোনো চেষ্টা জনদৃষ্টি এড়াবে না এবং নির্বাচনের পথে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ছলচাতুরী জনগণই প্রতিহত করবে। গত রোববার বিকেলে মহানগরী দক্ষিণ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ঢাকা-৮ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক জরুরি সভায় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে, জাতি কোনো তামাশা মেনে নেবে না। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডিসেম্বরের ১০ বা ১১ তারিখ তফশিল ঘোষণা করার সিদ্ধান্তও রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, একটি দল সংগঠিতভাবে নির্বাচন ভন্ডুল করার চক্রান্তে নেমেছে। তবে তার দাবি, কোনো ষড়যন্ত্রে নির্বাচন রোডম্যাপ পরিবর্তন হবে না, জনগণ ইতোমধ্যেই সতর্ক রয়েছে। নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্রকারীরা নানা ধরনের অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এসব অপপ্রচার রুখে দিতে হবে বলে জামায়াতের এ নেতা মন্তব্য করেন।
এদিকে গত শনিবার সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে ইসলামী ও সমমনা আট দলের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডাঃ শফিকুর রহমান বলেছেন, এতদিন যারা নির্বাচন চাই বলে-বলে জনগণকে পাগল করে তুলেছিল, তারা এখন ভিন্নসুরে কথা বলছে। এ লক্ষণ ভালো নয়। তারা হয়ত বুঝতে পেরেছে তারা যে সমস্ত কর্মকাণ্ড করেছে জনগণ তাদেরকে লাল কার্ড দেখানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
সূত্র মতে, আসছে রোজার আগেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শুরুতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনড় অবস্থানের কথা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবার ব্যক্ত করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রধান উপদেষ্টার অত্যন্ত আস্থাভাজন ও সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গত ২৬ অক্টোবর ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হচ্ছে এটি আরো পরিষ্কার করেছেন। ওই দিন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ‘মিট দ্য রিপোর্টার্স’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহফুজ আলম বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের সভা নভেম্বরেই শেষ হয়ে যাবে। তথ্য উপদেষ্টার এ বক্তব্যে স্পষ্ট হলো যে নভেম্বরের পর এ সরকার শুধু একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনী সরকারের ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ তখন নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করবে এবং এ সরকার শুধু তাদের রুটিন কাজ চালিয়ে যাবে।
তবে সম্প্রতি বিএনপির ‘অনিবার্য কারণ’ ছাড়া নির্বাচন পেছানো হবে না এমন মন্তব্যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে কি না এ নিয়ে জনমনে একটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, বেগম জিয়ার অসুস্থতার ইস্যুকে সামনে রেখে নির্বাচন পেছানোও হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, বিএনপি এখনো নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দেশের অধিকাংশ আসনেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরব। প্রায় প্রতিদিনই সংঘাত-সংঘর্ষ লেগেই আছে। হুমকি ধামকির পাশাপাশি বহিস্কার করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এছাড়া যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্র শরীকদের সাথে তাদের দূরত্ব তৈরী হয়েছে। ফলে ঘোষিত সময়ে নির্বাচন হলে ফলাফল তাদের পক্ষে নেয়াটা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নির্বাচন পেছানো হলে তারা দল গুছিয়ে মাঠে নামতে পারবে।
তবে বিএনপি নির্বাচন পেছাতে চাচ্ছে, যে বা যারা এ ধরণের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তাদের সে ধারণা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, সারা দেশে এখন নির্বাচনী হাওয়া বইছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ছুটছেন নির্বাচনী এলাকায়। ভোটাররাও তাদের এতদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন ভোট হবে, তারা তাদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করবে এবং সত্যিকারের প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে। এখানে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন পেছানোর কথা বলার প্রশ্নই আসে না।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন পেছানোর কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না দলের আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, নির্বাচন তো নির্বাচনের জায়গায়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নাই।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশনার মিডিয়ায় বলেছে, তারা শিগগির তফসিল ঘোষণা দেবেন। আমরা চাই বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যেন ইসি তফসিল ঘোষণা করে। তফসিল এমন সময়ে দেওয়া হোক যখন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে এবং সব দল যেন রাজনৈতিকভাবে নিজেদের ফুটিয়ে তোলার সমান সুযোগ পায়।